একদল নেককার মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করার ‘অপরাধে’ তৎকালীন শাসকের জুলুম থেকে বাঁচতে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই গুহায় তাঁরা একটানা ৩০০ বছর ঘুমিয়ে ছিলেন। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত অলৌকিক ও বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর মধ্যে আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসীদের ঘটনা অন্যতম। জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অবস্থিত একটি গুহা এখন স্থানীয় এবং বিদেশি পর্যটকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ। ধারণা করা হচ্ছে, এটিই কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের সেই গুহা।
গুহার রহস্য ও গঠনশৈলী
গুহাটির রক্ষণাবেক্ষণকারী মাহমুদ আল-হানিতি জানান, ‘এই গুহার ভেতরে সাতটি কবর বা সমাধি রয়েছে। গুহাটির ঠিক ওপরেই নির্মিত হয়েছে একটি প্রাচীন মসজিদ। মুসলিম পর্যটকদের জন্য এটি যেমন একটি দর্শনীয় স্থান, তেমন ইমানি চেতনার এক জীবন্ত সাক্ষী।’
এটিই কি সেই কাঙ্ক্ষিত গুহা?
বিশ্বজুড়ে আসহাবে কাহাফের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ৩৩টি গুহার কথা উল্লেখ থাকলেও, জর্ডানের এই গুহাটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। এটি ঐতিহাসিকদের কাছে আর-রাকিম নামে পরিচিত। গুহার রক্ষণাবেক্ষক হানিতি এর স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, গুহাটিতে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় আলোর যে বিশেষ গতিপথের কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে এই গুহার ভৌগোলিক অবস্থানের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এ ছাড়া গুহার ওপরে প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ প্রমাণ করে যে এটি আদিকাল থেকেই একটি পবিত্র স্থান হিসেবে স্বীকৃত।’
আসহাবে কাহাফের ঘটনা
পবিত্র কোরআনে এমন একদল যুবককে আসহাবে কাহাফ বলা হয়েছে, যাঁরা একজন খোদাদ্রোহী অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে বাঁচতে এবং নির্বিঘ্নে আল্লাহর ইবাদত করতে পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। আল্লাহ তাঁদের বিশেষ ব্যবস্থায় সুরক্ষা দেন এবং ৩০০ বছর পর্যন্ত তাঁদের ঘুমন্ত অবস্থায় রাখেন। এরপর তাঁদের আবার জাগিয়ে দেন এবং সেকালের মানুষের জন্য এক বিস্ময়কর ঘটনা ও নিদর্শন বানান।
সুরা কাহাফের ১৪টি আয়াতে আসহাবে কাহাফের আলোচনা এসেছে। সেই আলোচনায় যুবকদের সংখ্যা এবং তাঁরা কত দিন সেই গুহায় ঘুমিয়ে ছিলেন তা এসেছে। তবে ঘটনাটি কখন ঘটেছিল এবং কোথায় ঘটেছিল—এ ব্যাপারে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। যুবকদের সংখ্যা সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর যুগের মানুষের তিনটি মতের কথা বলা হয়েছে—তিনজন, পাঁচজন ও সাতজন। এরপর বলা হয়েছে, আসল সংখ্যা আল্লাহই ভালো জানেন।
এ ঘটনা কখন হয়েছিল, তা নিয়েও ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, ইসা (আ.)-এর জন্মের আগেই পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল। কেউ বলেছেন, গুহায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা ইসা (আ.)-এর জন্মের আগের হলেও ফের জেগে ওঠার ঘটনা তাঁর জন্মের পর। কেউ কেউ পুরো ঘটনাই ইসা (আ.)-এর জন্মের পর বলে মত দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, মহানবী (সা.)-এর জন্মের মাত্র ২০ বছর আগেই তাঁরা জেগে উঠেছিলেন। তবে দাকয়ানুস নামের অত্যাচারী রোমান সম্রাটের আমলেই এ ঘটনার সূচনা বলে সকলে মনে করেন।
ঘটনাটি কোথায় ঘটেছিল, তা নিয়ে দুটি মত রয়েছে। বেশির ভাগ মুফাসসির বলেছেন, ঘটনা জর্ডানের প্রাচীন নগরী পেত্রায় ঘটেছিল। কেউ বলেছেন, তুরস্কের ইজমিরে।
বর্তমানে এই গুহার ওপরের প্রাচীন মসজিদটি জর্ডানের মুসলিমদের কাছে অন্যতম প্রিয় ইবাদতস্থল। প্রতি শুক্রবার এখানে জুমার নামাজ আদায় করা হয়। ইবাদতের পাশাপাশি ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।
তথ্যসূত্র: ইনডিপেনডেন্ট উর্দু
আরও পড়ুন-
দুর্ঘটনা বা রোগে মারা গেলে শহীদ