পশ্চিম আফ্রিকার রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক মানচিত্রে মালি এক ঐতিহাসিক ভূখণ্ড। আর এই দেশটির বানি নদীর অববাহিকায় জেগে থাকা প্রাচীন শহর জেনিতে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক স্থাপত্য-বিস্ময়, যা মানুষ ও প্রকৃতির আত্মিক সম্পর্কের এক রূপকথা শোনায়। এটি ‘গ্রেট মস্ক অব জেনি’ (Great Mosque of Djenné)—বিশ্বের সর্ববৃহৎ কাদা বা মাটির তৈরি মসজিদ।
মরুভূমির তপ্ত বাতাসের মাঝে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই লালচে-বাদামি রঙের স্থাপনাটি আফ্রিকান সুদান-সাহেলীয় স্থাপত্যকলার এক চিরন্তন প্রতীক এবং ইউনেসকো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
সাধারণত বিশাল ও ঐতিহাসিক কোনো স্থাপনা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মার্বেল, পাথর বা পোড়ামাটির ইটের গাঁথুনি। কিন্তু জেনির এই গ্রেট মসজিদ তৈরি হয়েছে রোদে শুকানো মাটির ইট (স্থানীয় ভাষায় ‘ফেরে’), বালু, ধানের তুষ ও কাদার এক বিশেষ সংমিশ্রণে।
মসজিদের প্রাচীর ঘেঁষে অসংখ্য তাল কাঠ সুচের মতো বাইরে বেরিয়ে আছে। আপাতদৃষ্টিতে একে কাঠামোগত নকশা মনে হলেও মূলত এগুলো মসজিদের চিরস্থায়ী মাচা বা ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট বিশাল প্রাচীর ও সুউচ্চ মিনার নিয়ে পুরো মসজিদটি এক রাজকীয় দুর্গের মতো মনে হয়। বাইরে মরুভূমির খরতাপ থাকলেও মাটির তৈরি পুরু দেয়াল ভেতরের পরিবেশ রাখে শীতল ও প্রশান্তময়।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর কথা। জেনির ২৬তম রাজা ‘কোই কোনবোরো’ যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তখন তিনি তাঁর রাজপ্রাসাদটি ভেঙে সেখানে একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণ করেন। বহু শতক ধরে এই স্থানটি উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম প্রধান ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
কালের পরিক্রমায় ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের তোড়ে মূল ভবনটি একসময় জীর্ণ হয়ে পড়েছিল। পরে ১৯০৬-১৯০৭ সালে ফরাসি শাসনামলে, স্থানীয় দক্ষ মিস্ত্রিদের নিখুঁত নৈপুণ্যে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন নকশা বজায় রেখে বর্তমান অসাধারণ কাঠামোটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
জেনির মসজিদের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও ব্যতিক্রমী দিক হলো এর স্থায়িত্ব রক্ষার পদ্ধতি। মাটির তৈরি হওয়ায় আফ্রিকার তীব্র মৌসুমি বৃষ্টি ও ঝড়ে প্রতিবছর এর প্রলেপ ক্ষয়ে যায়। কিন্তু এটি ধসে পড়ে না; কারণ পুরো জেনি শহরের মানুষ পরম ভালোবাসায় একে টিকিয়ে রাখে।
প্রতিবছর বসন্তকালে এখানে আয়োজিত হয় এক ঐতিহাসিক উৎসব, যার নাম ‘ক্রিপিসাজ’। একে পুরো শহরের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসব বলা যায়।
এই উৎসবের জন্য নদীর পলিমাটি, ধান ভাঙা তুষ ও পানি দিয়ে বিশেষ কাদা তৈরি করে কয়েক দিন ভিজিয়ে রাখা হয়। উৎসবের দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঐতিহ্যবাহী ঢোলের তালে তালে পুরো শহর জেগে ওঠে। নারীরা নদী থেকে পানি বয়ে আনেন, যুবকেরা কাঁধে কাদার খামির তুলে দৌড়ান, আর তরুণেরা দেয়াল বেয়ে তালের কাঠে চেপে মসজিদের গায়ে নতুন কাদার প্রলেপ লাগায়। অভিজ্ঞ প্রবীণ মিস্ত্রিদের নিখুঁত নির্দেশনায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো মসজিদ পায় নতুন রূপ।
আধুনিক স্থাপত্য শিল্প যখন ইট-পাথর, লোহা আর কংক্রিটের যান্ত্রিকতায় বন্দী, সেখানে জেনির গ্রেট মসজিদ আমাদের নিয়ে যায় মাটির কাছে, প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মানুষের হাতের ভালোবাসার ছোঁয়ায় আবার নতুন করে জীবন ফিরে পায়। মাটির তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি সাহারা অঞ্চলের মানুষের শিল্পচেতনা, সামাজিক সংহতি এবং ঐতিহ্যের এক জীবন্ত কাব্য।
লেখক: শিক্ষার্থী, শরীফবাগ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা, ধামরাই, ঢাকা।