ইসলামের ইতিহাসে হিজরত ছিল এক মহৎ ত্যাগের সূচনা। মক্কার কাফিরদের অমানবিক নির্যাতন থেকে দ্বীন ও ইমান রক্ষার্থে সহায়সম্বল ছেড়ে মুসলিমরা মদিনায় পাড়ি জমান। তাঁদের সামনে তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কিন্তু মদিনার মুসলিমরা ভ্রাতৃত্বের যে সুমহান আদর্শ স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার।
ইসলামের প্রয়োজনে নিজের মাতৃভূমি ও পৈতৃক সম্পত্তি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরতকারী সাহাবিদের বলা হয় মুহাজির। অন্যদিকে, মদিনার যে মুসলমানরা নিজেদের অভাব ও দারিদ্র্য সত্ত্বেও মক্কাবাসী ভাইদের সাদরে গ্রহণ করে আশ্রয় ও সম্পদ ভাগ করে দিয়েছিলেন, তাঁদের বলা হয় আনসার বা সাহায্যকারী।
আনসারদের এই পরার্থপরতার গুণটি পছন্দ করে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তারা (আনসাররা) নিজেদের ওপর (মুহাজিরদের) প্রাধান্য দেয়, যদিও নিজেদের প্রয়োজন ও অভাব থাকে।’ (সুরা হাশর: ০৯)
মদিনায় হিজরতের পর নবীজি (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেন। সুন্দর শৃঙ্খলার জন্য কে কার সঙ্গে বসবাস করবেন, সেটাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। আনসারদের ত্যাগের বিপরীতে মুহাজিরদের পক্ষ থেকেও ছিল গভীর কৃতজ্ঞতা।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মুহাজিররা একবার রাসুল (সা.)-এর কাছে আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমরা এমন উত্তম মানুষ আর দেখিনি। তারা সামান্য বিষয়েও আমাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায় এবং আমাদের জন্য প্রচুর সম্পদ বিসর্জন দেয়। আমাদের ভয় হচ্ছে, আখিরাতের সব প্রতিদান হয়তো তারাই নিয়ে যাবে!’ নবীজি (সা.) তাঁদের আশ্বস্ত করে বললেন, ‘না, যতক্ষণ তোমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে এবং তাদের জন্য দোয়া করবে, তোমরাও প্রতিদান পাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৩০৭৫)
আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের এই অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ববন্ধনই মদিনায় একটি স্থায়ী ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। তাঁদের ত্যাগের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সর্বকালের মুসলমানদের জন্য এক অসীম প্রেরণার উৎস। আজকের সমাজে যদি আমরা সাহাবিদের সেই ভ্রাতৃত্বের সামান্য অংশও ধারণ করতে পারি, তবে শান্তি ও সম্প্রীতির এক নতুন পৃথিবী গড়া সম্ভব।