নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পাঠ করার পর দরুদ শরিফ পাঠ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা, আবার কোনো কোনো ফকিহের মতে তা ওয়াজিব। আমল ও ফজিলতের দিক থেকে নামাজের মধ্যে দরুদে ইবরাহিম পাঠ করা সবচেয়ে উত্তম ও সর্বজনবিদিত। কারণ, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের নামাজে পাঠ করার জন্য বিশেষভাবে এই দরুদটি শিক্ষা দিয়েছেন।
তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—কোনো কারণে দরুদে ইবরাহিম না পড়ে অন্য কোনো দরুদ পড়লে নামাজ হবে নাকি নামাজ পুনরায় পড়তে হবে? চলুন, হাদিস ও প্রখ্যাত ফকিহদের মতামতের আলোকে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদে ইবরাহিম পাঠ করা উত্তম হলেও এটি শতভাগ জরুরি বা বাধ্যতামূলক নয়। দরুদে ইবরাহিমের পরিবর্তে অন্য যেকোনো দরুদ পাঠ করলেও দরুদ পাঠের সুন্নত আদায় হয়ে যাবে এবং নামাজও শুদ্ধ হবে।
এমনকি কেউ যদি তাশাহহুদ পড়ার পর প্রচলিত সংক্ষিপ্ত দরুদ ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ পাঠ করে, তবুও তার নামাজের সুন্নত দায়িত্ব পালন হয়ে যাবে।
প্রখ্যাত ফকিহ ইবনে হাজার হাইতামি (রহ.) এ বিষয়ে বলেন:
‘যেকোনো শব্দে বা বাক্যে দরুদ পাঠ করলেই অর্পিত কর্তব্য পালন হয়ে যাবে। তবে সব দরুদের মধ্যে দরুদে ইবরাহিম পাঠ করা যে সর্বোত্তম, তা সর্বজনবিদিত।’
—(তুহফাতুল মুহতাজ,২ / ৪৭৮)
হানাফি মাজহাবের ফকিহগণের বক্তব্যও ইবনে হাজার হাইতামি (রহ.)-এর এই মতের অনুরূপ।
যেহেতু অধিকাংশ আলেমের মতে নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদ পাঠ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (ফরজ বা ওয়াজিব নয়), তাই কেউ ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত দরুদ পাঠ না করলেও তার নামাজ বাতিল হবে না এবং পুনরায় নামাজ পড়তে হবে না।
তবে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জোরদার সুন্নাহ। কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃত দরুদ ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ।
সাহাবি কাব ইবনে উজরা (রা.) এবং আবু মাসউদ উকবা ইবনে আমের আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন—আমরা আপনার ওপর কীভাবে সালাম পাঠ করব তা শিখেছি, কিন্তু কীভাবে দরুদ বা সালাত পাঠ করব?
উত্তরে মহানবী (সা.) তাদের স্বয়ং দরুদে ইবরাহিম শিক্ষা দেন:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা ‘আলা ইব্রাহীমা ওয়া ‘আলা আ-লি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা ‘আলা ইব্রাহীমা ওয়া ‘আলা আ-লি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারের ওপর রহমত অবতীর্ণ করুন, যেমন ইবরাহিম ও তাঁর পরিবারের ওপর করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও তাঁর পরিবারের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন ইবরাহিম ও তাঁর পরিবারের ওপর করেছিলেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। সহিহ বুখারি, ৩৩৭০; সুনানে দারাকুতনি
দরুদে ইবরাহিম নামাজের একটি মূল ও অত্যন্ত মহিমান্বিত অনুষঙ্গ। একজন সচেতন মুসলিমের দরুদে ইবরাহিম মুখস্থ না থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তাই সাময়িকভাবে অন্য দরুদ দিয়ে নামাজ আদায় হয়ে গেলেও, যাদের দরুদে ইবরাহিম মুখস্থ নেই, তাদের উচিত যত দ্রুত সম্ভব সঠিক উচ্চারণে এটি মুখস্থ করে নেওয়া এবং নামাজে আমল করা।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি (৩৩৭০), সুনানু আবি দাউদ (১৪৮১), সুনানে দারাকুতনি, শারহু মাআনিল আসার (১৫৬৩), শারহু মুখতাসারিত ত্বাহাবি (১ / ৬৪১), রাদ্দুল মুহতার (১ / ৫১২), তুহফাতুল মুহতাজ (২ / ৪৭৮), মিনহাতুল খালিক (২ / ৪৭)।