দৈনন্দিন জীবনে সাময়িক আর্থিক লাভ কিংবা বিনোদনের প্রলোভনে মানুষ জুয়ায় জড়িয়ে পড়ে। তবে বাহ্যিক বা সাময়িক লাভ দেখা গেলেও জুয়ার মূল পরিণাম চরম ক্ষতি ও ধ্বংস ছাড়া কিছু নয়। ইসলামি শরিয়তে জুয়াকে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।’ (সুরা বাকারা: ২১৯)। অন্য আয়াতে জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ উল্লেখ করে তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক তিরসমূহ—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা মায়িদা: ৯০)
নবী করিম (সা.) জুয়া এবং এর প্ররোচনাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছেন। হাদিসে এসেছে, কেউ যদি কাউকে খেলার ছলেও জুয়ার প্রস্তাব দেয়, তবে তাকেও কাফফারাস্বরূপ দান-সদকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে, “এসো তোমার সঙ্গে জুয়া খেলি”, সে যেন দান-খয়রাত করে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩০১)
রাসুল (সা.) জুয়া খেলাকে শূকরের গোশত ভক্ষণ করার মতো জঘন্য কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (আদাবুল মুফরাদ: ১২৮৯)। এ ছাড়া, জুয়াড়িদের পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, জুয়াড়ি, উপকার করার পর খোঁটাদানকারী এবং সর্বদা মদ্যপায়ী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সুনানে নাসায়ি: ৫৬৭২; মিশকাতুল মাসাবিহ: ৩৬৫৩)
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে এবং নবী যুগে আরব সমাজে বিভিন্ন উপায়ে জুয়ার প্রচলন ছিল—যেমন মোরগের লড়াই, কবুতর ওড়ানো, উটের খেলা বা পাশা-দাবা খেলায় বাজি ধরা। (আদাবুল মুফরাদ: ১২৭১-১২৮৮)। আধুনিক যুগে প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় জুয়ার ধরন বদলে গেছে। অনেক সরলমনা মানুষ এগুলোকে নির্দোষ বিনোদন মনে করে জড়িয়ে পড়ছেন।
জুয়ার প্রভাবে একজন ব্যক্তির দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় জীবন ধ্বংস হয়ে যায়:
» আর্থিক লোকসান ও অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস: জুয়ায় কোনো বৈধ বিনিময় ছাড়া অন্যের সম্পদ লুটে নেওয়া হয়, যা আল্লাহ তাআলা সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।
» ইবাদত ও দোয়া কবুল না হওয়া: জুয়ার আয় সম্পূর্ণ হারাম। হারাম উপার্জনে গঠিত শরীর নিয়ে কোনো ইবাদত বা দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। (সহিহ মুসলিম: ২২৩৬)
» শত্রুতা সৃষ্টি ও ইবাদতে উদাসীনতা: শয়তান জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মাঝে শত্রুতা তৈরি করে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। (সুরা মায়িদা: ৯১)
» মানসিক ও পারিবারিক বিপর্যয়: অর্থ হারিয়ে জুয়াড়ি ব্যক্তি মানসিক অস্থিরতা ও হতাশায় ভোগে, যা পারিবারিক কলহ, সংসার ভাঙন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।
» সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি: জুয়ার টাকার জোগান দিতে গিয়ে মানুষ চুরি, ডাকাতি ও দুর্নীতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।