ঈদ মানে আনন্দের বাঁধনহারা ঢেউ; ঈদ মানে ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে আপন করে নেওয়ার অনন্য উপলক্ষ। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর সংযম ও সবরের সোপান বেয়ে ঈদ আসে ভালোবাসার মালা নিয়ে। ঈদ নিছক উৎসব নয়, ত্যাগের মহিমায় নিজেকে শাণিত করার এক পবিত্র ক্ষণ। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সাম্য ও সম্প্রীতির কথা বলে ঈদ। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি জাতির উৎসব আছে, আর আমাদের উৎসব হলো এই দুই ঈদ।’ (সহিহ বুখারি: ৯০৪)
ভ্রাতৃত্বের নিবিড় বন্ধন
আরবি ঈদ শব্দের অর্থ আনন্দ, আর ফিতর বলতে বোঝায় রোজার সমাপ্তি। বছর ঘুরে দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনার পর আজ ঘরে ঘরে বইবে আনন্দের ফল্গুধারা। মুসলিম উম্মাহর জন্য এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঈদ আমাদের শেখায় ভ্রাতৃত্ব, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা। ধনী-গরিবনির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে শামিল হওয়ার প্রেরণা দেয় এই উৎসব। বিভেদমুক্ত জীবন ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হয়ে ওঠার নামই হলো ঈদ।
ঈদের ছোঁয়ায় আমাদের চারপাশে শুরু হয় সাজসাজ রব। বাঁকা চাঁদের মুচকি হাসিতে আকাশে বয় আনন্দের হিমেল হাওয়া। ঘরে ঘরে চলে ফিরনি-সেমাই আর কোরমা-পোলাওয়ের সুঘ্রাণ। সবাই সাধ্যমতো নতুন পোশাকে নিজেকে সাজায়। আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে এই আনন্দ পূর্ণতা পায়।
ঈদে সবচেয়ে বেশি মেতে ওঠে শিশুরা। বড়দের কাছ থেকে সালামি পাওয়ার খুশিতে তাদের চোখমুখ ঝলমল করে ওঠে। পাড়া-মহল্লায় তাদের অনাবিল ছুটোছুটি ঈদের আনন্দকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। মসজিদ থেকে শুরু করে ঈদের ময়দান—সবখানে মানুষের পুনর্মিলনী ঘটে। কোলাকুলির মাধ্যমে আদান-প্রদান হয় হৃদয়ের উষ্ণতা। মানুষের এই পরম মিলনমেলা আমাদের হাসতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়।
উৎসবের আঙিনায় ইমানি সচেতনতা
আনন্দের এই জোয়ারে যেন আমরা কখনো মহান আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত না হই। উৎসবের সাগরে ভেসে গিয়ে ইসলামের নিষিদ্ধ কাজে গা ভাসানো কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। ঈদ কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। বিজাতীয় আচরণ পরিহার করে নিজস্ব সংস্কৃতির ভেতরে থেকে পরিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে জীবন সাজানোর নামই ঈদুল ফিতর। ঈদের আমেজ যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির সীমানার ভেতরেই থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
হাদিস শরিফে এসেছে, প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যখন ঈদুল ফিতরের দিন আসে, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের কাছে বান্দাদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, হে ফেরেশতারা! যে শ্রমিক তার কাজ পূর্ণ করেছে, তার বিনিময় কী? ফেরেশতারা বলেন, তাদের পারিশ্রমিক পূর্ণরূপে প্রদান করা। তখন আল্লাহ ঘোষণা করেন, আমার বান্দারা তাদের দায়িত্ব পালন করে দোয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছে; আমার মর্যাদা ও মহত্ত্বের শপথ! আমি তাদের দোয়া কবুল করব এবং তাদের মন্দ আমলগুলো নেকিতে পরিবর্তন করে ক্ষমা করে দিলাম।’ (খুতবাতুল আহকাম)
ঈদের কেনাকাটা ও উদ্যাপনে অপব্যয় পরিহার করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা কোনোভাবেই অপব্যয় কোরো না, নিশ্চয়ই অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬-২৭)। এ ছাড়া ঈদের নাম করে জুয়া বা লটারির মতো শরয়ি গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্য-নির্ধারক তিরসমূহ নাপাক শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে সফলকাম হও।’ (সুরা মায়িদা: ৯০)
আর্তপীড়িতের পাশে দাঁড়ানো
ঈদের আনন্দ তখনই সর্বজনীন হবে, যখন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোও আমাদের খুশিতে শামিল হতে পারবে। নিজ সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই অভাবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। ঈদের আনন্দকে কেবল নিজেদের বৃত্তে সীমাবদ্ধ না রেখে এতিম ও দুস্থদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।
কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, ‘আত্মীয়স্বজনকে দেবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬)। রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘গোটা সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবার। অতএব, যে আল্লাহর পরিবারের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করে, সে আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয়।’ (সুনানে বায়হাকি)। তাই সামর্থ্যবানদের উচিত জাকাত ও সদকাতুল ফিতর আদায়ের মাধ্যমে গরিবের সাদাকালো জীবনে রঙের ছোঁয়া দেওয়া।
আমরা যখন ঈদের কেনাকাটা করতে যাব, তখন যেন পাশের অসহায় মানুষের কথা মাথায় থাকে, বাসার কাজের বুয়া, দারোয়ানের কথা যেন খেয়াল থাকে, স্মরণে থাকে যেন সমাজে বসবাস করা নিঃস্বজনের কথা; যাদের ঘরে কখনো ঈদ আসে না। আমাদের দেওয়া একটি রঙিন জামায় তাদের ঈদও রঙিন হোক।
আসুন, রমজানের আত্মশুদ্ধি নিয়ে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই। আমাদের ঈদ হোক পবিত্র, পরিচ্ছন্ন এবং মানবিক।