মানুষের জীবন-মৃত্যু, ভালো-মন্দ, রিজিক, সুস্থতা-অসুস্থতা—সবকিছুই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও হুকুমের অধীন। একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহর ইচ্ছায় জীবনের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো দোয়া। দোয়ার মাধ্যমে বান্দা নিজের প্রয়োজন, অসহায়ত্ব ও আকাঙ্ক্ষার কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে।
পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের জন্য নামাজ, রোজা ও অন্যান্য নেক আমলের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করাও জরুরি। তবে দোয়া কবুলের জন্য কিছু আদব ও শর্ত রয়েছে। কোরআন-হাদিসের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি শর্ত হলো—
দোয়া কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রার্থনা না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলেন, ‘যখন প্রার্থনা করবে, তখন শুধু আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে। যখন সাহায্য চাইবে, তখন শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে।’ (সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬)
দোয়ার ক্ষেত্রে শরিয়ত অনুমোদিত মাধ্যম বা অছিলা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে অছিলা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি। দোয়া ও সাহায্য প্রার্থনার মূল বিষয় হলো আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করা।
দোয়া করার পর দ্রুত ফল না পেলে হতাশ হওয়া উচিত নয়। দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা বড় বাধা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়ো করে বলে—আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, বান্দা যতক্ষণ পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া না করে এবং দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে, ততক্ষণ তার দোয়া কবুল হতে থাকে। তাড়াহুড়ো বলতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বুঝিয়েছেন—বান্দা বলতে থাকে, ‘আমি দোয়া করেছি, আমি দোয়া করেছি; কিন্তু আমার দোয়া কবুল হতে দেখিনি।’ এরপর তিনি হতাশ হয়ে দোয়া ছেড়ে দেন। (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৬)
দোয়ায় এমন কোনো বিষয় চাওয়া যাবে না, যা শরিয়তে পাপ বা অন্যায়। একইভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো কোনো বিষয়ের জন্যও দোয়া করা উচিত নয়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৬)
দোয়ার সময় আল্লাহ তাআলার রহমত ও ক্ষমতার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা জরুরি। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে, আমি তার প্রতি তেমনই।’ (সহিহ বুখারি: ৭৪০৫; সহিহ মুসলিম: ২৬৭৫)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করো, দোয়া কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রেখে।’ (সুনানে তিরমিজি)
তাই দোয়ার সময় আল্লাহর রহমত ও ক্ষমতা নিয়ে হতাশ না হয়ে তাঁর প্রতি সুদৃঢ় আশা রাখা উচিত।
দোয়ার সময় মনকে অন্য চিন্তা থেকে সরিয়ে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ রাখা উচিত। যাঁর কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে, তাঁর মহত্ত্ব ও ক্ষমতা অন্তরে জাগ্রত থাকা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহ উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দোয়া কবুল করেন না।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৪৭৯)
দোয়া কবুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্য গ্রহণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের কাছ থেকেই দোয়া কবুল করেন।’ (সুরা মায়েদা: ৫: ২৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যিনি দীর্ঘ সফর করে ধুলোমলিন অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব, হে আমার রব’ বলে দোয়া করেন। অথচ তাঁর খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম ও হারাম উপার্জন দিয়ে তিনি পরিপুষ্ট হয়েছেন। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম, ১০১৫)
ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, হারাম ভক্ষণ দোয়ার শক্তি দুর্বল করে দেয়।
দোয়ার ক্ষেত্রেও সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের রবকে ডাকো। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৫৫)
তাই দোয়ায় অশোভন, অন্যায় বা শরিয়তবিরোধী কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
দোয়া গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলেও এর কারণে ফরজ দায়িত্ব ও অন্যের প্রাপ্য অধিকার নষ্ট করা যাবে না। যেমন, ফরজ নামাজের সময় ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে শুধু দোয়ায় ব্যস্ত থাকা কিংবা দোয়া বা নফল ইবাদতে এমনভাবে মশগুল হওয়া, যাতে মা-বাবার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়—এটি সঠিক পদ্ধতি নয়।
কিছু বিশেষ সময় ও অবস্থাকে দোয়া কবুলের সম্ভাবনাময় সময় হিসেবে কোরআন-হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদের সময়, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় এবং বৃষ্টির সময় দোয়া করা। এ ছাড়া শুক্রবার আসরের পর সূর্যাস্তের আগের সময়কেও দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই এসব সময়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, দোয়া কবুল হওয়া মানে সব সময় বান্দা যে বিষয়টি চেয়েছে, ঠিক সেটিই সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া নয়। আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য যা কল্যাণকর, সে অনুযায়ী দোয়ার জবাব দেন।
দোয়া মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার অন্যতম মাধ্যম। তাই দোয়ার পাশাপাশি হালাল উপার্জন, নেক আমল, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও আল্লাহর প্রতি অটুট আস্থা রাখা জরুরি। দোয়া করে দ্রুত ফল না পেলেও হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে যেতে হবে।