হোম > ইসলাম

যে ১২ সময় দোয়া করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে

ইসলাম ডেস্ক 

পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে দোয়া করছেন এক হাজি। ছবি: সংগৃহীত

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদে, প্রতিটি নিশ্বাসে মানুষ মহান আল্লাহর করুণা ও সাহায্যের মুখাপেক্ষী। রবের সাহায্য ছাড়া মানুষের কোনো প্রচেষ্টা বা প্রার্থনাই পূর্ণতা পায় না। আর আল্লাহর অফুরন্ত রহমত ও অনুকম্পা লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ‘দোয়া’। ব্যাকুল অন্তরে বান্দা যখন রবের দরবারে হাত তোলে, আল্লাহ তাআলা তখন বান্দার খালি হাত ফিরিয়ে দিতে লজ্জিত হন; পরম মায়ায় তার প্রার্থনা কবুল করেন, অভাব মেটান এবং কাঙ্ক্ষিত বস্তু দান করেন।

দোয়া কবুলের প্রাথমিক শর্ত হলো—উপার্জন হালাল হওয়া, অন্তরে পূর্ণ একনিষ্ঠতা থাকা এবং ফলাফলের জন্য তাড়াহুড়ো না করা। এই শর্তসমূহ পূরণ হলে আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া অবশ্যই কবুল করেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে:

‘তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, আমাকে ডাকো; আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই অহংকারবশে যারা আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’

—(সুরা মুমিন: ৬০)

অন্য আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সান্নিধ্যের সুসংবাদ দিয়ে বলেন, ‘(হে নবী!) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদের বলুন,) আমি তো নিকটেই। কেউ যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই...’—(সুরা বাকারা: ১৮৬)

দোয়া কবুলের এই সাধারণ ওয়াদার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা তাঁর অশেষ মেহেরবানিতে দিন ও রাতের কিছু নির্দিষ্ট সময়কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এ সময়গুলোতে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। হাদিস শরিফের আলোকে দোয়া কবুলের এমনই ১২টি বিশেষ মুহূর্ত নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ফরজ নামাজের শেষে

হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবু উমামা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কোন সময়ের দোয়া সবচেয়ে বেশি কবুল হয়?’ রাসুল (সা.) উত্তরে বলেন, ‘রাতের শেষ প্রহরে এবং ফরজ নামাজের শেষে।’ (জামে তিরমিজি: ৩৪৯৯)।

মুহাদ্দিসগণের মতে, ‘ফরজ নামাজের শেষ’ বলতে দুটি সময়কে বোঝায়—

  • ক. সালাম ফেরানোর পূর্বে (তাশাহহুদ ও দরুদ পড়ার পর এবং দোয়া মাসুরা পাঠের সময়ে)।
  • খ. সালাম ফেরানোর পরপরই জিকির ও দোয়ার সময়ে।

উভয় ব্যাখ্যাই নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা সমর্থিত এবং রাসুল (সা.) উভয় সময়েই দোয়া করতে উৎসাহ দিয়েছেন।

২. রাতের শেষ প্রহরে (তাহাজ্জুদের সময়)

রাতের শেষ তৃতীয়াংশ দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময়ে মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের আহ্বান জানিয়ে বলতে থাকেন:

‘কে আছো আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব! কে আছো আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব! কে আছো ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করব!’

—(সহিহ বুখারি: ১১৪৫, সহিহ মুসলিম: ৭৫৮)

ফজরের সুবহে সাদিক পর্যন্ত এই রহমতের আহ্বান জারি থাকে।

৩. রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে

যারা রাতের শেষ প্রহরে জাগ্রত হতে পারেন না, তাদের জন্যও আল্লাহ বিশেষ সুযোগ রেখেছেন। রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে অন্য কথা না বলে যদি তাওহিদের বিশেষ জিকির করা হয় এবং এরপর ক্ষমা প্রার্থনা বা যেকোনো বৈধ দোয়া করা হয়, আল্লাহ তা কবুল করেন। (সহিহ বুখারি: ১১৫৪)। এরপর অজু করে নামাজ পড়লে সেই নামাজও কবুল হয়।

৪. আজানের সময়

রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেছেন যে, আজানের সময় আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং মানুষের প্রার্থনা সহজে ফেরত দেওয়া হয় না। (সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪০, মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৪০৭২)

৫. আজানের উত্তর দেওয়ার পর

আজানের বাক্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মুয়াজ্জিনের জবাব দেওয়া এবং সুন্নাহসম্মত দোয়া পাঠ করার পর আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন চেয়ে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সুসংবাদ হাদিসে এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৪)

৬. আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়

আজান এবং ইকামতের মধ্যবর্তী সামান্য সময়টুকু দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, আজান ও ইকামতের মাঝের সময়ে যে দোয়া করা হয়, তা ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সুতরাং তোমরা তখন দোয়া করো।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১২৫৪৮)

৭. জিহাদের ময়দানে তুমুল লড়াইয়ের সময়

হক ও বাতিলের সংগ্রামে যখন রণক্ষেত্রে সারিবদ্ধ অবস্থায় তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে, সে মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কৃত দোয়া মুহূর্তেই আসমানে পৌঁছে যায়। (কিতাবুদ দোয়া, তবারানি: ৪৮৯)

৮. সিজদারত অবস্থায়

বান্দা নামাজের সিজদা অবস্থায় আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

‘বান্দা আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদারত অবস্থায়। তাই তখন বেশি বেশি দোয়া করো।’

—(সহিহ মুসলিম: ৪৮২)

৯ ও ১০. রোজা ও সফর অবস্থায়

রোজাদার ব্যক্তির ইফতার পর্যন্ত সময় এবং মুসাফিরের সফরের সময়টুকু অত্যন্ত বরকতময়। হাদিসে বলা হয়েছে—পিতার দোয়া, রোজাদারের দোয়া এবং মুসাফিরের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (সুনানে কুবরা, বায়হাকি: ৩ / ৩৪৫)।

১১. জুমাবার বা শুক্রবারের বিশেষ মুহূর্ত

জুমার দিনে এমন একটি ক্ষুদ্র সময় রয়েছে, যে সময়ে কোনো মুসলিম বান্দা আল্লাহর কাছে যা-ই প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা দান করেন। (সহিহ বুখারি: ৯৩৫)। ওলামায়ে কেরামের মতে এটি লাভের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি সময় হলো—

  1. এক. খতিব মিম্বরে ওঠার পর থেকে জুমার নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত।
  2. দুই. জুমার দিন আসরের নামাজের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত।

১২. মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করা

কোনো মুসলিম যখন তার কোনো ভাইয়ের অগোচরে তার জন্য কল্যাণকামনা করে দোয়া করে, তখন ফেরেশতাগণ আমিন বলেন এবং বলেন—‘আল্লাহ তোমাকেও অনুরূপ দান করুন’। (সহিহ মুসলিম: ২৭৩২)। নিষ্পাপ ফেরেশতাদের এই দোয়ার বরকতে দোয়াকারীর নিজের প্রার্থনাও কবুল হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র: মাসিক আল-কাউসার