ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং নবী-জীবনের অসংখ্য স্মৃতির জীবন্ত এক সাক্ষী মদিনা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের পর এই নগরী হয়ে ওঠে ইসলামি সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। মদিনা নাম উচ্চারিত হলেই মুমিনের হৃদয়ে জেগে ওঠে এক অপার্থিব প্রশান্তি। এই পবিত্র নগরীর বাতাসে আজও মিশে আছে নবীজি (সা.)-এর অগণিত স্মৃতি, সাহাবায়ে কেরামের আত্মত্যাগ আর ইসলামের সোনালি দিনের সুবাস। মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদ ও স্থানগুলো তাই মুসলিমের হৃদয়ের আবেগ, ইতিহাস ও ইমানের জীবন্ত স্মারক। মদিনা ভ্রমণ শেষে সেই সব স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস নিয়েই আজকের এই আয়োজন। লিখেছেন হাফেজ মাওলানা আজিজুল হক।
আল-জুমআ মসজিদ মদিনা নগরীর একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি বনি সালিম মসজিদ, আল-ওয়াদি মসজিদ, আল-গুবাইব মসজিদ ও আতিকাহ মসজিদ নামেও পরিচিত। হিজরতের সময় মহানবী (সা.) কুবা থেকে মদিনায় আসার পথে ‘ওয়াদিয়ে রানুনা’ নামক স্থানে অবস্থান করেন এবং সাহাবিদের নিয়ে এখানেই ইতিহাসের প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন।
প্রথমে পাথর দিয়ে নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন যুগে মসজিদটির সংস্কার করা হয়। ১৯৮৮ সালে সৌদি সরকারের উদ্যোগে এর ব্যাপক পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। নতুন এই কমপ্লেক্সে ইমাম ও মুয়াজ্জিনের আবাসন, গ্রন্থাগার, কোরআন শেখার মাদ্রাসা, নারীদের নামাজের স্থানসহ আধুনিক সব সুবিধা যুক্ত করা হয়। প্রায় ৬৫০ জন ধারণক্ষমতার এই মসজিদটি ১৯৯১ সালে পুনরায় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
মদিনার সুপ্রসিদ্ধ মসজিদগুলোর মধ্যে ‘মসজিদে কিবলাতাইন’ বা দুই কিবলার মসজিদ অন্যতম। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা ফিলিস্তিনের পবিত্র বায়তুল মোকাদ্দাস বা আল-আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তিত হয়ে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামের দিকে নির্ধারিত হয়।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৪৪ নম্বর আয়াতে কিবলা পরিবর্তনের এই নির্দেশনা রয়েছে। ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি ঘটেছিল এই মসজিদে, যেখানে জোহরের নামাজ মতান্তরে আসরের নামাজরত অবস্থায় কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আসে। বাদশাহ ফাহাদের শাসনামলে ১৯৮৭ সালে মসজিদটি আধুনিক আদলে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি মদিনার অন্যতম দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা।
পবিত্র মদিনা নগরীর সালাহ পাহাড়ের পশ্চিম পাদদেশে অবস্থিত ‘মাসাজিদুস সাবআ’ বা সাত মসজিদ। পঞ্চম হিজরিতে সংঘটিত ঐতিহাসিক ‘গাজওয়াতুল খন্দক’ বা খন্দক যুদ্ধের স্মৃতি বহন করছে এই স্থানটি। যুদ্ধের সময় মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম এখানকার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে প্রতিরক্ষা ও পাহারার দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে সেই ঐতিহাসিক স্মৃতির স্মরণে সেখানে ছোট ছোট কয়েকটি মসজিদ গড়ে ওঠে। যদিও নাম ‘সাত মসজিদ’—বর্তমানে সেখানে ছয়টি মসজিদ দৃশ্যমান। এর মধ্যে ‘মসজিদে ফাতাহ’ সবচেয়ে বড়। এ ছাড়া হজরত সালমান ফারসি (রা.), আবু বকর (রা.), ওমর (রা.), আলী (রা.) এবং ফাতেমা (রা.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছোট ছোট মসজিদগুলোও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ।
মসজিদে আতবান বিন মালিক রাসুল (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান, যা মসজিদ আল-জুমআর প্রায় ৬০০ মিটার উত্তরে অবস্থিত। মদিনার অলিগলির বহু জায়গা নবীজি (সা.)-এর পদস্পর্শে ধন্য হয়েছে। এর মধ্যে আনসারদের বনু সালিম ইবনে আওফ শাখার সাহাবি এবং বদর যুদ্ধের বীর যোদ্ধা হজরত আতবান ইবনে মালিক (রা.)-এর বাড়িটি অন্যতম।
বার্ধক্য ও দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় তাঁর পক্ষে মসজিদে এসে জামাতে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অনুরোধ করেন, যেন তিনি তাঁর ঘরে এসে নামাজ আদায় করেন। নবীজি (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে তাঁর গৃহে আসেন এবং নির্দিষ্ট স্থানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। পরে সাহাবি সেই স্থানটি ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করে নেন। বর্তমানে সেখানে কোনো পাকা মসজিদ না থাকলেও সৌদি সরকার স্থানটি সংরক্ষিত ও ঘেরাও করে রেখেছে। আজও এই মাটির দিকে তাকালে নবীজি (সা.)-এর সিজদার পবিত্র স্মৃতির কথা মনে করে হৃদয় বিগলিত হয়।
মদিনার ঐতিহাসিক আনবারিয়া ট্রেন স্টেশনের ভেতরে অবস্থিত ‘আস-সাকিয়া মসজিদ’। এটি মসজিদে নববি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বদর যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে মহানবী (সা.) এই স্থানে নামাজ আদায় করেছিলেন এবং মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ করেছিলেন।
মসজিদের পাশেই ‘আস-সাকিয়া’ নামের একটি কূপ ছিল, যেখান থেকে নবীজি (সা.) পানি পান করেছিলেন এবং মদিনাবাসীর জন্য বরকতের দোয়া করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে খলিফা ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) এই ঐতিহাসিক স্থানে মসজিদটি নির্মাণ করেন। খলিফা ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে তীব্র খরার সময় তাঁর অনুরোধে হজরত আব্বাস (রা.) এই স্থানেই বৃষ্টির জন্য দোয়া করেছিলেন এবং অলৌকিকভাবে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। মদিনার প্রতিটি ধূলিকণায় জড়িয়ে আছে ইসলামের সোনালি ইতিহাস। এসব ঐতিহাসিক স্থানে গেলে মন প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে সাহাবিদের ত্যাগের ইতিকথায়।