সাক্ষাৎকার

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে: অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সফিউদ্দিন

বাংলাদেশে তিন দশকের বেশি সময় ধরে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা, শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সফিউদ্দিন। তিনি বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড স্ট্রোক সেন্টারের প্রধান। বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগের প্রকোপ, প্রধান ঝুঁকি, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বর্তমান সক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ।

দেশে হৃদ্‌রোগের বর্তমান পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

একসময় দেশে সংক্রামক ব্যাধিই মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এসব রোগের প্রকোপ কমেছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। এর সঙ্গে অসংক্রামক রোগের বোঝা বেড়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগ এখন বড় ঝুঁকি। একসময় হৃদ্‌রোগকে বয়স্কদের রোগ মনে করা হতো, এখন কম বয়সীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকের শুরুতে আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। তবে দ্রুত চিকিৎসায় অনেক রোগী সুস্থ হন। তাই প্রতিরোধ ও দ্রুত চিকিৎসায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশে কম বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতার বিষয়টি উদ্বেগের। এর প্রধান কারণগুলো কী?

হার্টে রক্ত সরবরাহ হয় করোনারি ধমনির মাধ্যমে। এসব ধমনিতে চর্বি বা প্লাক জমার প্রক্রিয়া খুব অল্প বয়সেই শুরু হতে পারে। তিন-চার বছর বয়স থেকেই এর সূচনা হতে পারে, যদিও তখন উপসর্গ থাকে না। দক্ষিণ এশিয়ায় কম বয়সে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেশি। এর বড় কারণ জীবনাচার। স্কুলে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা কমেছে, শহরে মাঠও কম। স্কুল-কলেজের ক্যানটিনে ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবার সহজলভ্য। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও গেমে দীর্ঘ সময় বসে থাকায় শারীরিক কার্যক্রম কমছে। ফলে ওজন ও কোলেস্টেরল বাড়ছে। ধূমপানও ঝুঁকি বাড়ায়। বংশগত কারণেও হৃদ্‌রোগ হতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাস, নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান ও স্থূলতার মতো পরিবর্তনযোগ্য কারণগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্‌স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়ার নির্দিষ্ট বয়স নেই; শিশুকাল থেকেই অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, স্থূলতা ও ধূমপান—এসব ঝুঁকির মধ্যে বর্তমানে কোনগুলো মূল প্রভাবক হয়ে উঠেছে?

সবগুলোই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে খাদ্যাভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত চিনি ও লবণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত চর্বি, বিশেষ করে ট্রান্স ফ্যাট, ক্ষতিকর। খাবারে একই তেল বারবার ব্যবহারও ভালো নয়। শারীরিক কার্যক্রম কমলে স্থূলতা বাড়ে; এতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বয়স ও বংশগতির মতো কিছু কারণ পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু ধূমপান, তামাক ও মাদক বন্ধ করা, অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা যায়। ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

তরুণদের মধ্যে ধূমপান, ভ্যাপিং, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি ও মানসিক চাপ বাড়ছে। ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগের বোঝা কমাতে কোন বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন?

শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও শরীরের যত্নের ব্যবহারিক শিক্ষা দিতে হবে। তা অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। শারীরিক কার্যক্রম ও মাঠের সুযোগ বাড়াতে, মোবাইল-ল্যাপটপে দীর্ঘ সময় বসে থাকা কমাতে হবে। ধূমপান, ভ্যাপিং ও মাদক বন্ধে পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে। জাঙ্কফুড, অতিরিক্ত তেল, চিনি ও লবণযুক্ত খাবার গ্রহণ কমাতে হবে। মানসিক চাপ এবং ঘুমেও গুরুত্ব দিতে হবে। ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথম কয়েক ঘণ্টা চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রোগীরা হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি করেন কেন এবং এই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ রক্ষায় কী করা দরকার?

আমাদের দেশে বুকব্যথা হলে অনেকেই প্রথমে সেটিকে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে করেন। অনেকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করেন। সব বুকব্যথা হার্ট অ্যাটাক নয়, কিন্তু নতুন বা অস্বাভাবিক বুকব্যথাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক বা ইসিজির সুবিধা না থাকায়ও দেরি হয়। এসটি-এলিভেশন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (গুরুতর বা মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক) হলে দ্রুত রক্তনালি খুলে দেওয়া জরুরি। রোগী দুই ঘণ্টার মধ্যে এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টির সুবিধাযুক্ত হাসপাতালে পৌঁছালে হার্টের ক্ষতি কমানো সম্ভব। এনজিওগ্রামে ব্লক শনাক্ত করে স্টেন্ট (রিং) দিয়ে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করা হয়। তবে এরপরও চিকিৎসার সুযোগ থাকে; উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে ছয় থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যেও চিকিৎসা উপকারী হতে পারে। যদি তাৎক্ষণিকভাবে পিসিআই (রিং পরানো) করার সুযোগ না থাকে, তবে উপযুক্ত রোগীকে দ্রুত থ্রম্বোলাইটিক থেরাপি দিয়ে কালবিলম্ব না করে বড় কার্ডিয়াক সেন্টারে স্থানান্তর করতে হবে।

ঢাকার বাইরে হৃদ্‌রোগের আধুনিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবা কতটা সহজলভ্য?

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও সব জায়গায় হার্ট অ্যাটাকের জরুরি চিকিৎসা নেই। অ্যাসপিরিন, ক্লপিডোগ্রেলসহ ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসিজির ব্যবস্থা থাকা দরকার। পারকিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন-পিসিআই বা রিং পরানো সম্ভব না হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত রেফার করতে হবে। টাকার জন্য দেরি হলে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। সরকারি ব্যবস্থায় এসব সেবা সহজলভ্য করতে হবে। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সিপিআর ও লাইফ সাপোর্টে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষের জন্য হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে রাষ্ট্রের কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

হৃদ্‌রোগের রোগীদের অ্যান্টিপ্লেটলেট (একধরনের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ যা রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকাকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে এই ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ), কোলেস্টেরল, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ প্রয়োজন হয়। একই ধরনের ওষুধের দাম কোম্পানিভেদে দুই-তিন গুণ পর্যন্ত পার্থক্য রয়েছে। তাই উৎপাদন খরচ, যুক্তিসংগত মুনাফা ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ওষুধশিল্পের অগ্রগতির সুফল রোগীদের কাছেও পৌঁছাতে হবে। পরীক্ষার খরচও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। স্টেন্টের (রিং) দাম সাম্প্রতিক সময়ে কমানো হয়েছে—এটি ইতিবাচক। এ সুবিধা একাধিক সরকারি হাসপাতালে থাকতে হবে। বড় সরকারি হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা রেখে বিনা মূল্যে বা ভর্তুকিতে স্টেন্ট ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার। দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যবিমাও শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের দেশে অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরুর আগেই খরচের চিন্তায় পড়ে যায়।