হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন তারকা হাসান পাইকার, যেভাবে তাঁর উত্থান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ট্যুইচ ইনফ্লুয়েন্সার হাসান পাইকার। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখন নতুন তারকা হাসান পাইকার। লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ‘ট্যুইচ’-এর মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের প্রভাবিত করার নতুন মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছেন এই প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ও সামাজিক-গণতান্ত্রিক ধারার প্রার্থীদের সমর্থনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় যেমন তিনি প্রশংসিত হচ্ছেন, তেমনি ইসরায়েল নীতি নিয়ে তাঁর সরব অবস্থানের কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন এই স্ট্রিমার।

সামাজিক মাধ্যমে ৩১ লাখেরও বেশি অনুসারী থাকা পাইকারের এই রাজনৈতিক প্রভাব মার্কিন মূলধারার রাজনীতিকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

পাইকারের পুরো নাম হাসান দোগান পাইকার। অনলাইনে ‘হাসানআবি’ (HasanAbi) নামে পরিচিত তিনি। হাসান পাইকার ১৯৯১ সালের ২৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের নিউ ব্রান্সউইকে এক তুর্কি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি মূলত ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় বেড়ে উঠেছেন এবং মুসলিম সংস্কৃতির আবহে তাঁর শৈশব কেটেছে। বর্তমানে তিনি নিজেকে ‘সাংস্কৃতিক মুসলিম’ হিসেবে পরিচয় দিলেও ধর্মীয় রীতিনীতির কট্টর অনুসারী নন বলে উল্লেখ করেন।

হাসান পাইকার ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ‘দ্য ইয়াং টার্কস’ (TYT)-এ কর্মরত থাকাকালীন ট্যুইচে স্ট্রিমিং শুরু করেন। ২০২০ সালে নেটওয়ার্কটি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণকালীন স্ট্রিমিং ক্যারিয়ারে মনোযোগ দেন। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, পাইকারের চ্যানেলটি এই প্ল্যাটফর্মের সর্বাধিক সাবস্ক্রাইব করা চ্যানেলগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মূলত ভিডিও গেম লাইভস্ট্রিমিংয়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত ‘ট্যুইচ’ কোভিড মহামারির সময় থেকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরে বন্দী থাকার সেই সময়ে গেমিংয়ের পাশাপাশি এটি চলচ্চিত্র, সংগীত এবং রাজনৈতিক আলোচনার এক নতুন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতির রক্ষণশীল বা ‘মাগা’ গোষ্ঠী প্রথমদিকে এই প্ল্যাটফর্মটিকে রাজনৈতিক প্রচারের কাজে ব্যবহারে সচেষ্ট হয়। তবে এর বিপরীতে প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হাজির হন হাসান পাইকার। গেম খেলার পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে তাঁর সাবলীল ও রসবোধপূর্ণ আলোচনা খুব দ্রুতই তাঁকে ট্যুইচের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজনে পরিণত করে।

সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার ও আন্তর্জাতিক ইস্যু, যেমন লোহিত সাগরে সংকটের মতো বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করছেন।

চলতি বছর হাসান পাইকারের বিপুলসংখ্যক তরুণ অনুসারী ডেমোক্রেটিক পার্টির মূলধারার বাইরের প্রার্থীদের জন্য বড় সহায়কে পরিণত হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির প্রচারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদসহ অন্য ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ প্রার্থীরা তাঁর স্ট্রিমে অংশ নিয়েছেন এবং তহবিল সংগ্রহে তাঁর সহায়তা পেয়েছেন।

সম্প্রতি মিশিগান নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে পাইকার তাঁর স্ট্রিমে একটি অডিও ক্লিপ প্রচার করেন। কথিত অডিওটিতে এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী জেরেমি মসকে বলতে শোনা যায়, তাঁর নির্বাচনের ‘মূল উদ্দেশ্য’ হলো ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সহায়তা নিশ্চিত করা।

অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কিংবা বিকৃত করার কোনো প্রমাণ না থাকলেও মূলধারার কিছু গণমাধ্যম সংবাদ পরিবেশনায় এটিকে ঘিরে সংশয় প্রকাশ করে।

যুক্তরাজ্য সরকার হাসান পাইকারকে জননিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দেশে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকেই মার্কিন গণমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে আলোচনা আরও জোরালো হয়।

সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেটিক দলীয় নেতা হাকিম জেফ্রিস পাইকারের কঠোর সমালোচনা করে তাঁকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ, ক্ষতিকর ও ইহুদিবিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির অন্য আইন প্রণেতারাও অভিযোগ করেছেন, তাঁর বক্তব্য বর্ণবাদী ও চরমপন্থী ভাবধারার সমতুল্য।

তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে পাইকারের সমর্থকেরা বলছেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর বিরোধী শিবিরের মূল অসন্তোষ মূলত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর নীতিগত ও ধারাবাহিক সমালোচনার কারণে।

বিশ্লেষকদের মতে, হাসান পাইকারকে ঘিরে তৈরি এই বিতর্কের পেছনে মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক সমর্থকদের মাঝে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের ধারাবাহিক পতন।

সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৩ শতাংশ ডেমোক্রেটিক ভোটার বর্তমানে ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।

বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের সমর্থকদের মধ্যে এই নীতিগত পরিবর্তনের জন্য দলের কৌশলগত ভুলত্রুটি বা চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের চেয়ে হাসান পাইকারের মতো প্রভাবশালী অনলাইন ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।