মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার এমন কিছু নথির গোপনীয়তা প্রত্যাহার (ডিক্লাসিফাই) করেছেন, যা তাঁর দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে চীনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ বহন করে। এর মাধ্যমে তিনি আবারও নির্বাচন নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিযোগ সামনে আনেন। তবে ২০২১ সালের একটি মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, যেখানে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হন, সেখানে বেইজিং কোনো প্রভাব ফেলেছিল বা ভোটের প্রযুক্তিগত কোনো দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রাইম-টাইমে সম্প্রচারিত ২৫ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনের আগে নির্বাচন নিরাপত্তাকে একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন। ওই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসে তাদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াই করতে হবে।
ভাষণে ট্রাম্প আবারও কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যদের ভোটার পরিচয়পত্র (ফটো আইডি) এবং ভোটার নিবন্ধনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার আইন পাসের আহ্বান জানান। যদিও দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সরকারি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ডেমোক্র্যাটদের তীব্র বিরোধিতার কারণে বিলটি বর্তমানে সিনেটে আটকে রয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেন, ডিক্লাসিফাই করা নথিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর ‘চমকে দেওয়ার মতো দুর্বলতা’ প্রকাশ করবে। তবে প্রকাশিত নথিগুলোর অনেকগুলোই তাঁর দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, আবার কিছু নথির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর কোনো সম্পর্কই নেই।
রাজনৈতিকভাবে কঠিন এক সময়ে ট্রাম্প এই ভাষণ দেন। ইরান যুদ্ধের অজনপ্রিয়তা এবং জ্বালানি মূল্যের উচ্চতার কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা চাপে রয়েছে। ভাষণের শুরুতে তিনি সংক্ষেপে ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বড় জয়’ অর্জন করছে। এরপর কর কমানো এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্যের কথা উল্লেখ করে নির্বাচন নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আসেন।
ট্রাম্পের দাবি, তিনি এমন সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করছেন, যা দেখাবে যে চীন অবৈধভাবে ২২ কোটি মার্কিন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্যের মধ্যে নাম, ঠিকানা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের সদস্যরা ইচ্ছাকৃতভাবে চীনের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত ব্যাপ্তি সম্পর্কে তথ্য গোপন করেছেন।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি অশ্রেণিবদ্ধ মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়, কোনো বিদেশি পক্ষ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটার নিবন্ধন, ব্যালট, ভোট গণনা বা চূড়ান্ত ফলাফলের মতো কোনো প্রযুক্তিগত দিক পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে বা সফল হয়েছে, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
এই মূল্যায়নটি করা হয়েছিল জন র্যাটক্লিফের নেতৃত্বে। তিনি তখন ট্রাম্পের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক ছিলেন এবং বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের সিআইএ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, অন্তত ২০০৮ সাল থেকে চীন মার্কিন ভোটার, জনমত, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব তথ্য নির্বাচনের ফলাফল পূর্বাভাস দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি জানান, চীনের হাতে যে ভোটার তথ্য গেছে তা গোপনীয় ছিল না। রাজনৈতিক পরামর্শকরা নিয়মিত এসব ভোটার ফাইল কিনে থাকেন এবং এসব তথ্য কোনোভাবেই পরিবর্তন বা কারসাজি করা সম্ভব নয়।
রয়টার্সকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের ভাষণের আগে হোয়াইট হাউসের কয়েকজন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে চীন-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন সম্পর্কে ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও অস্থির করে তুলতে পারে। গত বছরের ব্যয়বহুল বাণিজ্যযুদ্ধের পর সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল। ট্রাম্প আগামী সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আশা করছেন।
ট্রাম্পের ভাষণের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভাষণের আগে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং বলেন, ‘চীন কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।’
ট্রাম্প বহু বছর ধরে দাবি করে আসছেন যে ২০২০ সালের নির্বাচন কারচুপির মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, ডাকযোগে ভোটে ব্যাপক জালিয়াতি হয়, ভোটিং মেশিন বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং অ-নাগরিকদের ভোটদান ব্যাপকভাবে ঘটে। তবে অসংখ্য আদালতের রায় এবং ভোট পুনর্গণনায় ২০২০ সালের নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তারপরও ট্রাম্পের অবস্থান তাঁর সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়। এপ্রিলে পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ রিপাবলিকান বিশ্বাস করেন যে ২০২০ সালের নির্বাচন ট্রাম্পের কাছ থেকে ‘চুরি’ করা হয়েছিল। প্রমাণের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এই হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন মাত্র চারটি অঙ্গরাজ্যে ২ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি অ-নাগরিকের ভোটার নিবন্ধনের তথ্য পেয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে কতজন প্রকৃতপক্ষে ভোট দিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, পূর্বের কিছু ঘটনায় দেখা গেছে নাগরিকত্ব যাচাই ব্যবস্থা ভুলবশত বৈধভাবে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত কিছু মার্কিন নাগরিককে অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অ-নাগরিকদের প্রকৃত ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
ট্রাম্প দাবি করেন, ডিক্লাসিফাই করা নথিগুলো নির্বাচন নিরাপত্তার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ করবে। কিন্তু অনেক নথিই তাঁর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অথবা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কহীন। প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
গত মাসে প্রস্তুত করা সিআইএর একটি নথি, যা যুক্তরাষ্ট্র নয়, ভেনেজুয়েলার নির্বাচন নিয়ে।
আরেকটি নথিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী ভোট গণনা ব্যবস্থা এত ব্যাপক পরিসরে কারসাজি করা অত্যন্ত কঠিন, যাতে নির্বাচনের ফলাফল বদলে ফেলা যায়।’
সিআইএর আরেকটি নথিতে বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণাকে লক্ষ্য করে চীনা গোয়েন্দাদের কর্মকাণ্ডের বিবরণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বেইজিং ‘বর্তমানে গোপনে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপ করতে চায় না’, যদিও ভবিষ্যতে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ভাষণ চলাকালে সিনেটের গোয়েন্দা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার বিবৃতিতে বলেন, ‘চীন নিয়ে ট্রাম্পের তথাকথিত চমকপ্রদ বিস্ফোরক তথ্য সম্পূর্ণ ভুয়া। বাস্তবতা হলো, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছিল যে ২০২০ সালের নির্বাচনে চীন একটি ভোটও পরিবর্তনের চেষ্টা পর্যন্ত করেনি।’