কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনঃউন্মুক্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলা সাত মাসব্যাপী বিস্তৃত যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব পেশ করেছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে ওয়াশিংটনের কাছে এই প্রস্তাবটি হস্তান্তর করা হয়। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং দাবি পূরণের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর সহযোগীদের জানিয়েছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বোমারু বিমান হামলা শুরুর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই সংবাদের সত্যতা সরাসরি নিশ্চিত করতে পারেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তিতে আসতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে একমত হয়, তবে সমস্ত কিছু এখন প্রস্তুত রয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নিতে হবে; অবরুদ্ধ করা ইরানি তহবিল অবমুক্ত করতে হবে এবং জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে। এ ছাড়া লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কথাও এতে বলা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব মেনে নিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি দুই পক্ষ পারস্পরিক সম্মত বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনায় বসতে পারে। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
তবে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও মূল অবস্থানে অনড় রয়েছে তেহরান। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই শান্তি প্রস্তাব মেনে নিলেও পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে ইরান কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখাবে না বা কোনো ছাড় দেবে না। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখা এবং উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, তেহরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক বোমার মালিক হতে দেওয়া হবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে সাত মাসে গড়িয়েছে। এই দীর্ঘ সংঘাতে ইরানের বিপুল সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং দেশটির অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে।
ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলা চালানোর পাশাপাশি রিয়াদকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আজ শনিবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা দুটি হুতি ড্রোন এবং খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ পথগুলোও ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের মুখে সৌদি আরব মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমন্বয় জোরদার করছে। পাকিস্তানের ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার রিয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সামরিক সমন্বয় নিয়ে বৈঠক করেছেন। এর আগের দিন মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন।