মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় গতকাল রোববার বলেছেন, তিনি তেহরানের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করলেও তাঁর আশা—আগামী সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু হবে। সূত্র বলছে, এই আলোচনা শুরু হতে পারে আজ সোমবারই। তবে ইরান বলেছে, তারা আলোচনার দরজা বন্ধ করেনি, তবে তারা তাদের মৌলিক দাবিগুলো থেকে পিছু হটবে না।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আল আরব আল–জাদিদের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের কর্মকর্তারা নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে সাইডলাইনে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা নিয়ে যান। এর পর হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচলের পথ আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল ওই পরিকল্পনায়।
ট্রাম্প পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ফের পূর্ণমাত্রার বিমান হামলা শুরু করার হুমকি দিয়েছেন। তবে তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, তিনি আশা করছেন আলোচনা আবার শুরু হবে। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু সেটা আমি যে চুক্তি করতে চাই, তা নয়। এটা এমন একটি চুক্তি, যেটিতে হয়তো আমরা এক বছর আগে সম্মত হতাম।’ ট্রাম্প বলেন, ‘তারা নিজেদের অবস্থানকে অতিরিক্ত বাড়িয়ে বিবেচনা করছে।’
রোববার প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা সোমবার থেকেই শুরু হতে পারে। রোববারও হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের শর্তে অটল ছিল ইরান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের উপসাগরীয় ফ্রন্ট অচলাবস্থার মধ্যেই রয়েছে। অন্যদিকে ইয়েমেনে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। এটি এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রায় সাত মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা শুরু করার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তাদের পরিকল্পনায় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব জায়গায় সব ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি এর আগে হওয়া একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তে ফিরে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে, যে চুক্তিটি পরে ভেঙে পড়ে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে লড়াইয়ের সময় ওই চুক্তিটি ভেঙে যায়। চুক্তিটিতে ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা, ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বন্ধ করার কথা ছিল। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাগচি রোববার বলেন, ‘আমাদের শর্তগুলো স্পষ্ট, এবং এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। আমরা এসব শর্ত থেকে পিছু হটব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কখনো কূটনীতি বা আলোচনার দরজা বন্ধ করিনি। তবে একই সঙ্গে আমরা কখনো আমাদের অধিকার থেকেও পিছু হটিনি।’
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অভিযোগ করেছেন, আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার বিনিময়ে তেহরান অতিরিক্ত অনেক কিছু দাবি করছে। রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি ছিল একটি বেশ কৌশলী প্রচেষ্টা, এমন কিছু প্রস্তাব টেবিলে তোলার, যেগুলো তারা জানতই যে গ্রহণযোগ্য নয়। অবরোধ প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদে প্রবেশাধিকার চাওয়া, শুধু আলোচনায় বসার জন্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক মাস আগেই আমরা চেষ্টা করেছি। তাই এবার প্রেসিডেন্টের আস্থার মাত্রা খুব বেশি না থাকার বিষয়টি অনেকটাই সাধারণ বোধগম্যতার ব্যাপার।’
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস রোববার জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন ডুবো ড্রোন জব্দ করেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, ডুবো যানটি ‘গুপ্তচরবৃত্তির উদ্দেশ্যে’ ব্যবহার করা হচ্ছিল। তারা আরও বলেছে, এটি এখন ‘তথ্য উদ্ধারের জন্য বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের হাতে’ রয়েছে।
যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরান জুন মাসে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এর কিছুদিন পরই ওই চুক্তি ভেঙে পড়ে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান হামলা চালানোর পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ইরানের অভিযোগ ছিল, এসব জাহাজ জলপথ দিয়ে চলাচলের জন্য অনুমোদিত পথ থেকে সরে গিয়েছিল।
ইরান নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের কারণ দেখিয়ে জাহাজগুলোকে প্রণালিতে প্রবেশের আগে অনুমোদন নিতে বাধ্য করে। যেসব জাহাজ এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের নিয়মিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা জবাব হিসেবে মাঝে মাঝে ইরানের উপকূলীয় এলাকায় বোমা হামলা চালায়। জাতিসংঘে আরাগচি বলেন, কাতারের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পৌঁছে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।’
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেবিকে উদ্ধৃত করে দেশটির তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তিনি বলেছেন, ‘ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করব না।’ মোহেবি মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শত্রুতা বন্ধ করার জন্য তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে ইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করাও রয়েছে।