যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে বেইজিংয়ের সহায়তার প্রয়োজন নেই ওয়াশিংটনের। দীর্ঘ ৯ বছর পর বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় এ মন্তব্য করেন। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি না, ইরান বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্য দরকার।’ একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, ‘যেভাবেই হোক আমরা এই যুদ্ধে জয়ী হব।’
ট্রাম্পের ৩ দিনের এই চীন সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কঠিন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আছেন। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং বেড়ে যাওয়া মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁর জনপ্রিয়তার হার কমে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এই মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হয়েছে।
যুদ্ধের ফলে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি দিয়ে আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ পরিবাহিত হতো। এখন সেখানে তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে এবং জ্বালানির দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই বিপর্যস্ত করতে পারে।
ইরান ইস্যু তাঁর সঙ্গে সি চিনপিংয়ের আলোচনায় কতটা গুরুত্বপাবে—সে বিষয়ে ট্রাম্প পরস্পরবিরোধী ইঙ্গিত দেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হবে। সত্যি বলতে কী, আমি মনে করি তিনি তুলনামূলকভাবে ভালো আচরণ করেছেন।’
কিন্তু কয়েক মিনিট পরই তিনি যেন অবস্থান বদলে ফেলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আলোচনার জন্য অনেক বিষয় আছে। সত্যি বলতে, আমি বলব না যে ইরান সেগুলোর একটি। কারণ ইরানকে আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।’
স্থানীয় সময় আজ বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প চীনে পৌঁছাবেন। আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পর তিনি হোটেলে যাবেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তিনি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন এবং শুক্রবার সি চিনপিংয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ২০২৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত এশিয়া–প্যাসিফিক ইকোনমিক কো–অপারেশন সামিটের ফাঁকে সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল এই দুই নেতার।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় চীন সফর। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর এটাই প্রথম সফর। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষ দিকে সি চিনপিংও যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। বেইজিং সফর থেকে ট্রাম্প চাইছেন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য। তিনি চান, চীন যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি খাদ্যপণ্য ও উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে। ট্রাম্প বলেন, সি চিনপিংয়ের সঙ্গে তিনি বাণিজ্য নিয়েই ‘বেশি’ কথা বলবেন।
দুই নেতার আলোচনায় তাইওয়ানের অবস্থানও বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ, স্বশাসিত দ্বীপটির কাছে অস্ত্র বিক্রি করার মার্কিন পরিকল্পনা নিয়ে চীন বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। সোমবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাইওয়ানের জন্য অনুমোদিত ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা করবেন।
এর আগে, ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কয়েক দিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীন সফর করেন। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে—তার চীনের সহায়তা প্রয়োজন নেই, তবু জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা বেইজিংকে তেহরানের ওপর তাদের প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন। চীন এখনো ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ক্রেতা। সংঘাত চলাকালেও বেইজিং তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যদিও সরাসরি জড়িত হওয়া এড়িয়ে গেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রকাশ্যে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে সহায়তা করে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানের সঙ্গে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে বাণিজ্যের অভিযোগে একের পর এক চীনা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বেইজিং এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং নিজেদের কোম্পানিগুলোকে ওই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে।