ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের একের পর এক আক্রমণাত্মক বক্তব্য এখন খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। হেগসেথ ধারাবাহিকভাবে দাবি করছেন, মার্কিন হামলার তীব্রতা প্রতিদিন বাড়ছে, কিন্তু মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে—গত তিন সপ্তাহে অভিযানের গতিতে জোয়ার-ভাটা লক্ষ করা গেছে।
যুগ্ম চিফ অব স্টাফ জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে একাধিক সংবাদ সম্মেলনে পিট হেগসেথ বারবার দাবি করেছেন, প্রতিটি নতুন দিন হবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এযাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার দিন। ৪ মার্চ তিনি বলেছিলেন, ‘আরও বড় এবং শক্তিশালী হামলার ঢেউ আসছে; আমাদের প্রতিরক্ষা দপ্তর অভিযানের গতি বাড়াচ্ছে, কমাচ্ছে না।’
১০ মার্চ তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, ‘আজকের দিনটি হবে ইরানের ভেতরে আমাদের সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন।’ এমনকি গত বৃহস্পতিবারও তিনি দাবি করেন, ওই দিনের হামলা হবে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ‘স্ট্রাইক প্যাকেজ’।
হেগসেথের এই বাগাড়ম্বরের বিপরীতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রকাশিত তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযানের প্রথম দিনেই (২৮ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন বাহিনী সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে (এক হাজারটির বেশি) আঘাত হেনেছিল। এর পর থেকে হামলার হার ক্রমাগত বাড়ার বদলে বরং ওঠানামা করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ৯ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী গড়ে প্রতিদিন ৩৩৩টি করে হামলা চালানো হয়েছে। অথচ ঠিক ওই সময়কালেই (১০ মার্চ) হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে সেটিই হবে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার দিন। একইভাবে ১৩ থেকে ১৬ মার্চের মধ্যে দৈনিক গড় হামলার সংখ্যা কমে ২৫০-এ দাঁড়িয়েছে, যদিও হেগসেথ তখন ‘সর্বোচ্চ ভলিউমের’ হামলার দাবি করেছিলেন।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেগসেথের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার এই অমিলের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, একটানা তিন সপ্তাহ অভিযানের পর এখন বিমান এবং যুদ্ধজাহাজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। যেমন—মার্কিন রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মেরামতের জন্য অভিযান থেকে সাময়িকভাবে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। যদিও রণতরিতে টানা ৩০ ঘণ্টা আগুন জ্বলছিল বলে খবর বেরিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এর কারণ স্পষ্ট করেনি। তারা বলেছে, টয়লেট ফ্ল্যাশ ঠিকঠাক কাজ করছিল না বলে সেটি বন্দরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান সিএনএনকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তাদের দীর্ঘদিনের তৈরি করা ‘টার্গেট লিস্ট’ শেষ করে ফেলেছে। এখন নতুন লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা তথ্যের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে হামলার গতি মন্থর হয়ে গেছে।
অপরাজিত ইরান?
হেগসেথ দাবি করেছিলেন যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’ এবং তাদের কোনো বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনী অবশিষ্ট নেই। তবে বাস্তবতা হলো, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশ ও মার্কিন বাহিনীর ওপর পাল্টা আঘাত অব্যাহত রেখেছে। এমনকি গত বৃহস্পতিবার একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পেন্টাগনের এই অতিরঞ্জিত বয়ান এবং রণক্ষেত্রের প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান এখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন