জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো একা নিরাপত্তা নিশ্চিত বা বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বিশ্ব নজিরবিহীন নানা সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া নিজের শেষ ভাষণে গুতেরেস বলেন, গত এক দশকে যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ বিশ্বকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের বিভাজন এখন ‘ফাটল থেকে গভীর খাদে’ পরিণত হয়েছে।
মহাসচিব বলেন, বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে, বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং মানবিক সহায়তাকর্মীরা নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনও বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। একই সময়ে ভূরাজনৈতিক বিভাজন বেড়েছে, বৈষম্য তীব্র হয়েছে ও পারস্পরিক আস্থা কমেছে।
গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গে গুতেরেস জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর ফিলিস্তিনের গাজায় যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পুরো সময়ে তিনি এমন মাত্রার ঘটনা দেখেননি। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ ও গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানান।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও বসতি সম্প্রসারণ শান্তির পথকে আরও কঠিন করে তুলছে বলেও মন্তব্য করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান যেন ‘চোখের সামনে হারিয়ে না যায়’, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন গুতেরেস। একই সঙ্গে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়িঘর, জ্বালানি ও পানি অবকাঠামো এবং পরিবহনব্যবস্থায় হামলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জলবায়ু সংকট নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন গুতেরেস। তাঁর অভিযোগ, বড় তেল কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের ক্ষতির মধ্যেও বিপুল মুনাফা করেছে। তিনি জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পাঁচটি বড় পশ্চিমা তেল কোম্পানি প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজন তহবিলে সর্বশেষ হিসাবে ছিল মাত্র ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
গুতেরেস বলেন, বিশ্বকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে বিভক্ত হওয়ার প্রবণতা এড়াতে হবে। সামরিক, অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত শক্তি শান্তি, স্থিতিশীলতা কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রয়োজন। তাঁর মতে, ক্রমেই সরকারগুলোর কাছ থেকে ক্ষমতা কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির হাতে চলে যাচ্ছে এবং স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র এখন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
গুতেরেস জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে ২১ শতকের বাস্তবতায় অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করাই ভবিষ্যতের পথ।
গুতেরেস জানান, জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংস্থাটির সব জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব, সদর দপ্তর ও পেশাদার কর্মীদের মধ্যে লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সমতা কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত।