বেইজিংয়ে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গতকাল রোববার বলেছেন, ওয়াশিংটনে বৈঠকের একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র কিনতে আগ্রহী কি না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন: আমরা সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি করি। একপর্যায়ে তিনি প্রেসিডেন্ট সি-কে আসলে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি কি কিছু অস্ত্র কিনতে চান?’
তাইওয়ানের জন্য রেকর্ড ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ অনুমোদনে ট্রাম্প দেরি করেছেন কি না, এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পারডিউ এ মন্তব্য করেন। ধারণা করা হচ্ছিল, সি চিনপিংকে সন্তুষ্ট রাখা এবং চীনা নেতার সঙ্গে তাঁর বৈঠকগুলো যাতে ভেস্তে না যায়, সে কারণেই ট্রাম্প এই অনুমোদন বিলম্বিত করেছেন কি না। তবে ট্রাম্প এ প্রস্তাব চলতি সপ্তাহের শীর্ষ বৈঠকের সময় দিয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো সময়ে, যেমন মে মাসে বেইজিংয়ে তাঁদের বৈঠকের সময়, তা পারডিউ স্পষ্ট করেননি।
ট্রাম্পের এ মন্তব্য আরও বিস্ময়কর, কারণ তাঁর প্রশাসন বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ইরানকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের এশিয়া নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জ্যাক কুপার বলেন, ‘ট্রাম্পের কথিত চীনকে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবটি উন্মাদনাপূর্ণ। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, সি চিনপিং হয়তো বলতে চেয়েছিলেন: ‘সব আইটেমের একটা করে দিন, প্লিজ।’ একই সময়ে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিতে ট্রাম্প অনীহা দেখাচ্ছেন, অথচ চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছেন, এটি বিস্ময়কর।’
শীর্ষ বৈঠকের আগে তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা উদ্বিগ্ন ছিল যে, সি চিনপিংয়ের কাছ থেকে কোনো বিনিময়মূল্য আদায়ের জন্য ট্রাম্প হয়তো তাইওয়ানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দুর্বল করে দিতে পারেন। মে মাসে বেইজিংয়ে তাঁদের সর্বশেষ বৈঠকের পর ট্রাম্প উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তখন তিনি তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রিকে ‘ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
পারডিউয়ের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চেয়ে করা অনুরোধের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস।
প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে হোয়াইট হাউসের এশিয়া-বিষয়ক সাবেক শীর্ষ উপদেষ্টা ডেনিস ওয়াইল্ডার বলেন, ট্রাম্প হয়তো ‘প্রেসিডেন্ট সি-কে একটু উসকে দিচ্ছিলেন’, যাতে তাঁকে মার্কিন অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া যায়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমনকি এ ধরনের রসিকতাও বিপজ্জনক। ওয়াইল্ডার বলেন, ‘তাইওয়ান এবং পূর্ব এশিয়ায় আমাদের মিত্রদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে এমনকি রসিকতা করাও চীনের সামরিক আগ্রাসনের হুমকিকে প্রেসিডেন্ট কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন, তা নিয়ে বিদ্যমান সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।’
তাইওয়ান বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ নাকচ করে পারডিউ বলেন, ‘আমি যতজনকে দেখেছি, তাঁদের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে (ট্রাম্প) তাইওয়ানের বিষয়ে যতটা শক্ত অবস্থানে দেখেছি, ততটা আর কাউকে দেখিনি।’ চীনকে সন্তুষ্ট করার জন্য ট্রাম্প ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজটি আটকে রেখেছেন, এমন ধারণাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া বৃহস্পতিবার জানায়, সি চিনপিং বলেছেন, বেইজিং ‘আশা করে, যুক্তরাষ্ট্র ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করার সঠিক অবস্থান বজায় রাখবে।’
পারডিউ বলেন, তাইওয়ান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ‘এক চীন’ নীতি। এই নীতির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংকে চীনের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের ওপর চীনের সার্বভৌমত্বের দাবিকে স্বীকার না করেও তা সম্পর্কে অবগত থাকার অবস্থান বজায় রাখে। ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজটি কবে অনুমোদন করা হবে, সে বিষয়ে পারডিউ কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি শুধু বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা “চলমান” রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প তাইওয়ানের কাছে রেকর্ড ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিলেন। ইউএস-তাইওয়ান বিজনেস কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিলেন, ট্রাম্পের অনুমোদিত অঙ্ক তার চেয়ে বেশি। তিনি আরও বলেন, ১৯৭৯ সালের পর দায়িত্ব পালন করা যেকোনো মার্কিন নেতার তুলনায় ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য ৫০ শতাংশেরও বেশি অস্ত্র অনুমোদন করেছেন।
রোববার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রে তাইওয়ানের কার্যত রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ইউই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান সরবরাহকারী। আমরা আশা করি, যত দ্রুত সম্ভব আমরা ওই অস্ত্রের (প্যাকেজটির) অনুমোদন পেতে পারব।’