• ইরান যুদ্ধ সরাসরি থামানোর ক্ষমতা নেই, তবে জানুয়ারি থেকে খরচে লাগাম টানার সুযোগ রয়েছে।
• ট্রাম্পের অভিবাসন ও বাণিজ্য নীতিতে লাগাম টানার সুযোগ তৈরি হলো ডেমোক্র্যাটদের।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। এই জয়ের পর আলোচনায় এসেছে, ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, অভিবাসন নীতির কী হবে, সেটাও রয়েছে আলোচনায়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জয়ের পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের অনেক অ্যাজেন্ডা আটকে দিতে পারবেন। তদন্ত শুরু করতে পারবেন। অবশ্য প্রেসিডেন্টের ভেটো নাকচ করার জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে যে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়, তা তাদের নেই। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত একেবারে খারিজ করতে পারবে না ডেমোক্রেটিক পার্টি। তবে সিদ্ধান্ত বদলে চাপে ফেলতে পারবে দলটি। এসব পদক্ষেপের কারণে ইরান যুদ্ধে শিগগির সুখবর না এলেও ইউক্রেনে মার্কিন সহায়তা বাড়বে। এ ছাড়া ট্রাম্পের অভিবাসন ও বাণিজ্য নীতিতে লাগাম টানার সুযোগ তৈরি হলো ডেমোক্র্যাটদের।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে যাঁরা জয়লাভ করেছেন, তাঁদের নিয়ে কংগ্রেসের অধিবেশন বসবে জানুয়ারিতে। পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট অব রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, এর অর্থ হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের জন্য পরবর্তী দুই মাস অত্যন্ত সংকটজনক হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই ট্রাম্প যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াতে পারেন। পারসি বলেন, ‘তিনি এমন এক আচরণবিধি দেখিয়েছেন, যেখানে অপমান এবং পরাজয়ের মুখে পড়লে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।’
এদিকে ডেমোক্র্যাটরাও এই যুদ্ধের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করবেন কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ, এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করলে তা সরাসরি সেনাদের ওপর প্রভাব পড়ে। আর এতে দেশের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটা বিবেচনায় নিয়ে ডেমোক্র্যাটরাও খানিকটা নমনীয় থাকবেন। তবে নতুন করে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের যে বিরোধ হবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। ফলে আগামী ১১ ডিসেম্বর বর্তমান সরকারি অর্থায়ন বিলের মেয়াদ শেষ হলে আইনপ্রণেতারা বাড়তি সামরিক বাজেট আটকে দিয়ে ট্রাম্পের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর বড় ধরনের বাজেট-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধের জন্য খুব একটা সুখবর না এলেও ইউক্রেনের জন্য খানিকটা স্বস্তির হতে পারে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই সময় ব্যাপক সাহায্য পেয়েছে ইউক্রেন। তবে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। তিনি ইউক্রেনের জন্য তহবিল কমিয়ে ফেলেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করে নেন। জার্মানির গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে ইউক্রেনের কাছে ৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই অস্ত্র শিগগির পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফেরায় সেই অস্ত্র ইউক্রেনকে দ্রুত দেওয়ার বিষয়ে চাপ দিতে পারেন তাঁরা।
এ প্রসঙ্গে ডয়চে ভেলের সাবেক সাংবাদিক এবং বর্তমানে ব্লুমবার্গ গভর্নমেন্টের সম্পাদক ব্র্যান্ডন কনরাডিস বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করে বিভিন্ন সময়ই বলেছে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের জন্য যথেষ্ট কিছু করছেন না। তাঁরা এমন আইন প্রণয়নের জন্য চাপ দিতে পারেন, যার মাধ্যমে ইউক্রেনকে আরও সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে।
গত বছর মার্কিন বাণিজ্যঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে প্রায় ৯০টি দেশের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তোলা এই পদক্ষেপ ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিলেও ট্রাম্প প্রশাসন সেই রায় এড়ানোর বিকল্প পথ বের করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ ভোটের রায়ের কয়েক দিন পর ট্রাম্প ভিন্ন একটি আইনের অধীনে নির্বাহী আদেশে সই করে শুল্কনীতিতে আরও অনড় অবস্থান নেন এবং তা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেন। তবে কংগ্রেস কর্তৃক মেয়াদ বাড়ানো না হলে এই শুল্কের কার্যকারিতা ১৫০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকট আরও তীব্র করার জন্য দায়ী করেছেন ডেমোক্র্যাটরা। কারণ, এই শুল্কের চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিন আমদানিকারকদের ওপরই পড়ে, যা তারা ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। এ কারণে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘আমেরিকান জনগণের পকেট কাটার’ অভিযোগ তুলেছেন ডেমোক্র্যাটরা। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস হয়তো কিছু ছাড় বা ব্যতিক্রমের দাবি তুলতে পারে, যা রপ্তানিকারকদের কিছুটা স্বস্তি দেবে, তবে মার্কিন বাণিজ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের পর ট্রাম্প পরিবারের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি অ্যাপস্টাইনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের পদক্ষেপগুলো নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হতে পারে। এমনকি এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের চেষ্টাও করতে পারেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ব্যাপক তদন্ত শুরু করতে পারেন এবং তাঁদের এমন পরিকল্পনাও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শরণার্থী ও অভিবাসী প্রত্যাবাসন নীতির আওতায় মার্কিন কর সংস্থা (আইআরএস) এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মধ্যকার সহযোগিতাপূর্ণ কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে ডেমোক্র্যাটরা তাঁদের নতুন সমন জারি করতে পারেন।
বিমানবন্দরে মানুষকে আটক করা এবং অভিবাসন মামলার শুনানি নেওয়া ছিল গণবহিষ্কার বাস্তবায়নে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার অংশ; যা ছিল তাঁর ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম। এই উদ্যোগ এবার আটকে যেতে পারে। কারণ, নির্বাচনের আগে ফক্স নিউজের প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন অভিবাসনবিরোধী এই দমন-পীড়ন ‘সীমা ছাড়িয়ে গেছে’। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলে ট্রাম্পের এই অভিবাসননীতিতে খানিকটা পরিবর্তন আসতে পারে।