ডিজেল নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি পুতিনকে উপহার দেওয়ার শামিল অভিহিত করে সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি মনে করেন, লাখ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের নতুন চুক্তির ফলে রাশিয়া যে অর্থ পাবে, তা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ব্যবহার করবে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় হয়েছে’।
শনিবার হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলার অনুমতি দিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে জেলেনস্কি ‘বিশ্বের জন্য সমস্যা তৈরি করতে চান’। তাঁর উচিত ‘থেমে যাওয়া’।
এরপর ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের এমন একজন ‘নতুন নেতা পাওয়া উচিত, যিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে ডিজেলসহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ওই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেলজাতীয় পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে জ্বালানির বড় উৎপাদক রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্প্রতি পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে। এতে জ্বালানির বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, রাশিয়ার সঙ্গে আপনারা যা খুশি করতে পারেন, কিন্তু তেল শোধনাগারে হামলা করবেন না। কারণ, এর ফলে সারা বিশ্বে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তিনি অনেক চুক্তি করতে পারতেন, কিন্তু কোনো এক কারণে তিনি তা কখনোই করেন না।’
পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘প্রতীকী ও ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থেই শান্তির দিকে মনোযোগী।
শুক্রবার ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ৭ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখতে মস্কোর সঙ্গে একটি সমঝোতা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি বলেন, এই চুক্তির ফলে মস্কো নতুন অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। সেই অর্থ দিয়ে তারা নতুন সামরিক সরঞ্জাম কিনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
জাপোরিঝঝিয়ায় রাশিয়ার নতুন প্রাণঘাতী হামলার পর জেলেনস্কি আরও অভিযোগ করেন, মস্কো এই চুক্তিকে এমনভাবে দেখছে যে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে এবং ‘শহরগুলোতে বোমা ফেলতে থাকবে’।
শনিবার জেলেনস্কি কয়েকটি মিত্রদেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তিনি ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘কার্যকর সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার আহ্বান জানান।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁর প্রতি ‘পূর্ণ সংহতি’ জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার ডিজেল চুক্তির সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও। তিনি জেলেনস্কির বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ফলে মস্কো যুদ্ধ চালানোর জন্য আরও বেশি রাজস্ব পাবে।
কালাস জানান, সোমবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় প্যাকেজ অনুমোদনের পরিকল্পনা করছেন ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এটিই হবে সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ।
ওয়াশিংটন-মস্কোর চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া প্রাথমিকভাবে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে’ ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, এরপর আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। পরে ‘অল্প সময়ের মধ্যে’ আরও ৩০ লাখ টন সরবরাহ করা হবে। তবে শেষ পর্যায়ের সরবরাহ রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর অবস্থার ওপর নির্ভর করবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
গত ১০ মাসে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে দুই দফায় তীব্র জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন আনুমানিক ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
এর আগেও গত বছরের ডিসেম্বরে ইউক্রেনে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তখন তিনি বলেছিলেন, জেলেনস্কিকে পরিবর্তন করার সুযোগ ইউক্রেনের ভোটারদের দেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে দেশটিতে সামরিক আইন জারি রয়েছে। এর ফলে নির্বাচন স্থগিত আছে।