যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে, তার একটি বিস্তারিত টাইমলাইন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নিহত জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি (উভয়ের বয়স ২৭) পিএইচডির শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দুটি প্রথম ডিগ্রি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
শেষ যোগাযোগ: ১৬ এপ্রিল
তদন্ত অনুযায়ী ১৬ এপ্রিল দিনভর লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে বন্ধুদের যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে তাঁরা নিখোঁজ হয়ে যান। নজরদারি ক্যামেরায় দেখা যায়, বৃষ্টি ক্যাম্পাসে হাঁটছিলেন। এক বন্ধু তাঁর জন্য চশমা নিয়ে আসার কথা বললেও তিনি আর দেখা দেননি।
ফোনের তথ্য অনুযায়ী, লিমন সন্ধ্যার দিকে নিজের বাসা ও ক্যাম্পাসের আশপাশে ছিলেন। পরে তিনি প্রায় ৩২ মাইল দূরের ক্লিয়ারওয়াটারে যান। একই সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহর গাড়িও ওই এলাকায় দেখা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অবস্থানগত তথ্যের মধ্যে মিল পাওয়া যায়।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহর ফোন থেকে একটি অনলাইন অর্ডার করা হয়। এই অর্ডারে আবর্জনার ব্যাগ, জীবাণুনাশক ও সুগন্ধি স্প্রে কেনা হয়। একই রাতে আরেক রুমমেট দেখেন, আবুঘারবিয়েহ তাঁর কক্ষ থেকে বড় বড় বাক্স নিয়ে ডাম্পস্টারে ফেলছেন।
নিখোঁজ ও সন্দেহজনক গতিবিধি: ১৭ এপ্রিল
সেদিন ভোররাতের মধ্যেই অভিযুক্ত দুবার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় যাতায়াত করেন। এর আগে তাঁর ফোনে ‘স্টেট পার্কে গাড়ি পরীক্ষা করা হয় কি না’—এমন একটি অনুসন্ধান পাওয়া যায়।
এদিকে লিমন ও বৃষ্টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়। পরদিন পুলিশ বৃষ্টির কর্মস্থলে গিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্র অক্ষত অবস্থায় পায়, যা ইঙ্গিত দেয় তিনি স্বেচ্ছায় কোথাও যাননি।
পারিবারিক তথ্য ও অতীত
২২ এপ্রিল তদন্তকারীরা অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁর ছেলে রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় ভোগেন এবং অতীতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করেছেন। ২০২৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগও উঠেছিল, যদিও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার: ২৩ এপ্রিল
পুলিশ একটি ডাম্পস্টার থেকে রক্তমাখা মেঝের ম্যাট, লিমনের ওয়ালেট, বৃষ্টির গোলাপি ফোনের কেস এবং রক্তাক্ত পোশাক উদ্ধার করে। একই সময় অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহ তাঁর গাড়ি তল্লাশির অনুমতি দিলেও দেখা যায়, গাড়ির সব তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বারবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন। প্রথমে বলেন, ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা কখনো তাঁর গাড়িতে ওঠেননি। পরে বলেন, তিনি মাছ ধরার জায়গা খুঁজতে ক্লিয়ারওয়াটারে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে দাবি করেন, লিমন তাঁকে বৃষ্টিকে নিয়ে সেখানে যেতে বলেছিলেন।
তদন্তকারীরা আরও লক্ষ করেন, অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহর শরীরে একাধিক তাজা আঘাতের চিহ্ন ছিল। বিশেষ করে তাঁর বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ ও কেটে যাওয়ার দাগ ছিল। ওই দিনই তিনি অনলাইনে ‘নিখোঁজ বিপজ্জনক প্রাপ্তবয়স্ক’ শব্দের অর্থ খুঁজেছিলেন।
মরদেহ উদ্ধার ও গ্রেপ্তার: ২৪ এপ্রিল
পুলিশ হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছাকাছি একটি স্থানে একটি কালো আবর্জনার ব্যাগ উদ্ধার করে, যেখানে একজন পুরুষের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। পরে এটি লিমনের বলে শনাক্ত হয়। ময়নাতদন্তে জানা যায়, ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
সেদিনই ফ্লোরিডার লুটজে পারিবারিক বসতি থেকে আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালত ও নতুন তথ্য: ২৫–২৬ এপ্রিল
২৫ এপ্রিল অভিযুক্ত আবুঘারবিয়েহকে আদালতে হাজির করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার পাশাপাশি মৃতদেহ গোপন করা, প্রমাণ নষ্ট করা ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
২৬ এপ্রিল প্রসিকিউটররা আরও তথ্য প্রকাশ করেন। জানা যায়, ঘটনার আগেই অভিযুক্ত অনলাইনে টেপ, আবর্জনার ব্যাগ, আগুন ধরানোর উপকরণ কিনেছিলেন। এমনকি তিনি অনলাইনে চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেছিলেন—‘মানুষকে ব্যাগে ভরে ফেলে দিলে কী হয়?’ এবং ‘কীভাবে ধরা পড়বে?’
একই দিনে সেতুর আশপাশের পানিতে আরও মানবদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়, যা শনাক্তের কাজ চলছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, সেটি বৃষ্টির হতে পারে।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তদন্ত এখনো চলছে এবং আদালতের পরবর্তী শুনানিতে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।