যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) পিএইচডি গবেষণারত দুই কৃতী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টি ও জামিল লিমনের নৃশংস মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো ট্যাম্পা শহর এবং উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি। ভিনদেশের মাটিতে পরিবার ও স্বজনদের ছেড়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে আসা এই দুই মেধাবীর এমন পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
নাহিদা বৃষ্টি (২৭) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে গবেষণারত ছিলেন এবং জামিল লিমন পড়াশোনা করছিলেন জিওগ্রাফি, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিসি নিয়ে। সহপাঠীদের তথ্যমতে, লিমন ২০২৪ সালে এবং বৃষ্টি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ফ্লোরিডায় আসেন। অত্যন্ত মেধাবী এই দুই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কাছেই অত্যন্ত প্রিয় ও বিনয়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস প্রথম জামিল লিমনের মরদেহ উদ্ধার করে। এর পরপরই পুলিশি অভিযানে লিমনের রুমমেট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিশাম আবুঘারবিয়াহকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়। সপ্তাহান্তের অনুসন্ধানে পুলিশ আরও কিছু দেহাবশেষ উদ্ধার করে, যা নাহিদা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, একটি বাড়িতে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার পর সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ শেষে হিশাম আত্মসমর্পণ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার অভিযুক্ত হিশামকে আদালতে তোলা হলে বিচারক কোনো জামিন ছাড়াই তাঁকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ—দুটি প্রথম ডিগ্রি মার্ডার (পরিকল্পিত হত্যা) ; অননুমোদিত অবস্থায় দেহাবশেষ সংরক্ষণ; মৃত্যুর তথ্য গোপন করা; শারীরিক লাঞ্ছনা ও ভুয়া বন্দিত্ব এবং প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা।
হিলসবোরো কাউন্টির স্টেট অ্যাটর্নি সুসান লোপেজ আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মামলাটি এখন গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে অভিযুক্তের জন্য মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে কি না।’
সহপাঠীদের আবেগঘন স্মৃতিচারণা
আদালতের শুনানিতে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সালমান সাদিক শুভ অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘লিমন ছিল শান্ত স্বভাবের ছেলে, আর বৃষ্টি ছিল অত্যন্ত মিশুক। আমরা এখানে একে অপরের পরিবার ছিলাম। দেশ থেকে আট হাজার মাইল দূরে এসে আমাদের এই বন্ধুরাই ছিল সব। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া, উৎসব পালন—সবই ছিল ওদের ঘিরে।’
রিফাতুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে আমরা আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি মনে করতাম, সেখানে এমন ঘটনা ঘটবে—তা কল্পনাতীত। আমরা আমেরিকার বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল এবং আমরা চাই এই অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএ) এবং মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (এমএসএ) এই সংকটে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এমএসএ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নাহিদা ও জামিল কেবল মেধাবী শিক্ষার্থীই ছিলেন না, তাঁরা আমাদের কমিউনিটির অত্যন্ত প্রিয় দুজন সদস্য ছিলেন। তাঁদের অভাব পূরণ হওয়ার নয়।’ বিএসএ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে যাতে নিহতদের মরদেহ ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা করে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যায়।
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বাংলাদেশি দূতাবাস শোক প্রকাশ করেছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে বলে জানা গেছে।