মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব কিউবার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করছেন। এর মধ্যে কয়েক হাজার মার্কিন সেনাকে নিয়ে বিমান হামলার পরিকল্পনাও। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য এই বিমান হামলাটি পরিচালনা করবে ১০১ তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন। এই ডিভিশন এ ধরনের অভিযানের জন্য প্রশিক্ষিত একমাত্র ইউনিট। তবে কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই পরিকল্পনা পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা পেন্টাগন ইতোমধ্যে এমন কোনো অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কিউবার বিরুদ্ধে যেকোনো সামরিক অভিযান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কারণ, বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক সম্পদ ও সক্ষমতা নিয়োজিত রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এখনো এমন একটি কূটনৈতিক সামধানের পক্ষে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নিতে আগ্রহী একটি টেকনোক্র্যাটিক কিউবান সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তবে কিউবার সামরিক বাহিনী এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক কংগ্লোমারেট জিএইএসএ-এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক চাপ বাড়ানো সত্ত্বেও সেই প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে রয়েছে।
গত ১১ জুলাই এক বিবৃতিতে রুবিও বলেন, কিউবার সরকার এবং তাদের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত গোষ্ঠী’ এখনো সংস্কার প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। এর পরিবর্তে তারা ‘তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে’ এবং ‘নৈতিকভাবে দেউলিয়া মার্ক্সবাদী আদর্শে’ অটল রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আরও জানিয়েছে, তারা কিউবার রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান এমন আয় সরকারের হাতে পৌঁছে দেয়, যা শাসকগোষ্ঠী এবং কিউবার জনগণকে দমনকারী আধাসামরিক বাহিনী, বিশেষ করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্রিগেডগুলোর (Rapid Response Brigades) কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত মাসে পেন্টাগনে একটি ‘কনসেপ্ট অব অপারেশনস’ ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে কিউবায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের প্রাথমিক পর্যায়ের বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করা হয়। এ ধরনের বিকল্প পরিকল্পনায় সাধারণত মিশনের উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয় সেনাসংখ্যা, রসদ ব্যবস্থাপনা, সময়সূচি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।
কর্মকর্তারা বলেছেন, বিমান, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং অন্যান্য সামরিক সম্পদের বড় অংশ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযান চলমান থাকায় অদূর ভবিষ্যতে কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পর্দার আড়ালে ইরান সংঘাত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মধ্যে উত্তেজনাও প্রকাশ করেছে। সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে হেগসেথ এবং সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের প্রশংসা করলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়ানোর একটি আগের সুযোগ হাতছাড়া করেছে।
দুই কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানান, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের উদ্বেগ সত্ত্বেও হেগসেথ আরও কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। সংঘাত প্রত্যাশার তুলনায় দীর্ঘায়িত ও জটিল হয়ে ওঠায় ট্রাম্প ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন বলে জানা গেছে। কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, সামরিক অভিযানের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি যখন হেগসেথ এবং কেইন ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরেন, তখন উভয়ের প্রতিই প্রেসিডেন্ট বিরক্তি প্রকাশ করেন।
প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং বিভিন্ন আন্তঃসংস্থা পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সমালোচনা করেছেন। সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে কী অর্জন করা সম্ভব, সে বিষয়ে কুপার অতিরঞ্জিত মূল্যায়ন করেছিলেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালে হেগসেথ এবং কুপারের নেতৃত্ব নিয়ে ‘অত্যন্ত গর্বিত’ ছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ‘যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে হামলা চালাতে পারে এবং ইরান এর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারে না।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উৎপাদন স্থাপনা, নৌবাহিনী, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আরও বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত প্রেস সচিব জোয়েল ভালদেজের বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য বা কাল্পনিক সামরিক অভিযান নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করি না।’ একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা সম্পর্কেও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।