হোম > বিশ্ব > পাকিস্তান

পাকিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করা মার্কিন কোম্পানি ড্রোন বেচে ভারতেও, আছে ইসরায়েলি সংযোগও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে পাওয়ারাসের চেয়ারম্যান ও সিইও অ্যান্ড্রু ফক্স। ছবি: পাকিস্তান আইএসপিআর

মাত্র এক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন নির্মাতা কোম্পানি পাওয়ারাসের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানিটির সঙ্গে ভারতের একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের চুক্তি এবং এর এক সহপ্রতিষ্ঠাতার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অতীত থাকায় এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তরে পাওয়ারাসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। কোম্পানিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।

বৈঠকের এক দিন পর পাওয়ারাস জানায়, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তারা মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ইউএএস ব্যবস্থার জন্য একটি ‘ছোট ক্রয়াদেশ’ পেয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সই করার কথাও জানায় কোম্পানিটি। তবে ক্রয়াদেশটির মূল্য কত এবং এতে কোন কোন ব্যবস্থা রয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

পাকিস্তানের ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকেরা বলছেন, চুক্তিটি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, তিন মাসেরও কম সময় আগে পাওয়ারাস ভারতের একটি প্রতিরক্ষা পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে ভারতে তাদের ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি তৈরি ও বিক্রির একচেটিয়া অধিকার দিয়েছে। এ ছাড়া পাওয়ারাসের একজন সহপ্রতিষ্ঠাতা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য। পাকিস্তান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না এবং গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, পাকিস্তান যখন নিজেই ড্রোন তৈরি করে এবং চীন ও তুরস্ক থেকেও ড্রোন কেনে, তখন গত বছর প্রতিষ্ঠিত একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে কেন সম্পর্ক তৈরি করছে, যার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এবং যে একই সঙ্গে ভারতের বাজারেও কাজ করছে

টরন্টোভিত্তিক প্রতিরক্ষা সংবাদ ও বাজার-গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম কুয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বিলাল খান আল জাজিরাকে বলেন, পাওয়ারাস যেসব ড্রোন প্রকাশ্যে দেখিয়েছে, সেগুলোর প্রতিটিই পাকিস্তান ইতিমধ্যে তৈরি করে অথবা তৈরির সক্ষমতা রাখে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের জন্য পাওয়ারাসের অবস্থান কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

পাকিস্তান কী চুক্তি সই করেছে

পাওয়ারাসের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস বা আইএসপিআর একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, দুই পক্ষ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়, উৎপাদন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে। তবে এতে কোনো সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করা হয়নি। পাওয়ারাস আল জাজিরাকে জানায়, সমঝোতা স্মারকটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সই হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ক্রয়াদেশ দিয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

কোম্পানিটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সই হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্রয়াদেশটি দিয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।’ পাওয়ারাসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এর মাধ্যমে কোনো ক্রয়ের বাধ্যবাধকতাও তৈরি হয়নি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও সরকারি অনুমোদনের অধীন থাকবে।

কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্রেট ভেলিকোভিচ বলেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করতে পারায় তারা গর্বিত। তাঁর মতে, এই সমঝোতা স্মারক ভবিষ্যতে দুই পক্ষের সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি কৌশলগত কাঠামো তৈরি করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেলিকোভিচ আরও জানিয়েছেন, পাওয়ারাস পাকিস্তানে প্রযুক্তি তৈরির সুযোগ খুঁজছে।

এ বিষয়ে আল জাজিরা পাকিস্তানের আইএসপিআর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য চাইলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।

ট্রাম্পের দুই ছেলের বিনিয়োগ

পাওয়ারাস প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২৫ সালে। ফ্লোরিডাভিত্তিক এই কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক-তালিকাভুক্ত কোম্পানি অরিয়াস গ্রিনওয়ে হোল্ডিংসের সঙ্গে একীভূত হতে যাচ্ছে। অরিয়াস গ্রিনওয়ে ফ্লোরিডায় গলফ কোর্সের মালিক। চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে এই একীভূতকরণ সম্পন্ন হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প ‘আমেরিকান ভেঞ্চারস’ নামের একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাওয়ারাসে বিনিয়োগ করেছেন।

মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, একীভূত হওয়ার পর গঠিত কোম্পানিতে আমেরিকান ভেঞ্চারসের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্রকৃত মালিকানা অংশ থাকার কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি পাওয়ারাসের একজন নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারী। কোম্পানিটির পরিচালনা বা চুক্তিতে তার কোনো ভূমিকা নেই। পাকিস্তানের সঙ্গে কোম্পানিটির চুক্তির বিষয়েও তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না।

হোয়াইট হাউসও বলেছে, এ ক্ষেত্রে কোনো স্বার্থের সংঘাত নেই।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাওয়ারাস প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরি করে। গত মাসে কোম্পানিটি মার্কিন বিমানবাহিনীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৯ কোটি ডলার মূল্যের একটি চুক্তিও পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিদেশে সরকারি প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের চুক্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয় কি না, জানতে চাইলে পাওয়ারাস জানায়, ট্রাম্পের দুই ছেলে কোম্পানিটির কার্যক্রমে কোনো ভূমিকা রাখেন না।

কোম্পানিটির ভাষ্য, ট্রাম্পের ছেলেরা পাওয়ারাসের উপদেষ্টা নন। দেশীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে কোম্পানিটি কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে বা কীভাবে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাতেও তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোম্পানির পরিচালনা কাঠামোয়ও তাদের কোনো ভূমিকা নেই। পাওয়ারাস বলেছে, তাদের সরকারি সম্পর্কগুলো কোম্পানির নিজস্ব যোগ্যতা ও ভিত্তির ওপর পরিচালিত হয়।

ভারতের সঙ্গে আগের চুক্তি

দক্ষিণ এশিয়ায় পাওয়ারাসের প্রথম চুক্তি পাকিস্তানের সঙ্গে হয়নি। চুক্তিটি হয়েছিল পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। গত বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী হলেও তীব্র সংঘাত হয়। ওই সংঘাতে দুই পক্ষই ড্রোন ব্যবহার করেছিল। ৩০ জুন ভারতের শেয়ারবাজারে দেওয়া এক নথিতে পারাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস টেকনোলজিস জানায়, পাওয়ারাস তাদের ভারতে গার্ডিয়ান-১ ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি তৈরি ও বিক্রির একচেটিয়া লাইসেন্স দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের সম্মানসূচক প্রভাষক মনসুর আহমেদ বলেন, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কাছেই অস্ত্র বিক্রি করে আসছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এর আগে গ্রিস ও তুরস্ককে এফ-১৬ এবং মিসর ও ইসরায়েলকে এফ-১৬ বিক্রি করেছে। এখন সৌদি আরবকেও এফ-৩৫ বিক্রি করছে, যে যুদ্ধবিমান ইসরায়েল ইতিমধ্যে ব্যবহার করছে।

পাকিস্তান সরকারের সাবেক এক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা সম্ভবত ভারতের সঙ্গে পাওয়ারাসের চুক্তির বিষয়ে জানতেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা সম্ভবত ভারতের সঙ্গে পাওয়ারাসের সম্পৃক্ততার বিষয়ে অবগত ছিলেন। একই কোম্পানি থেকে পাকিস্তান ও ভারতের সামরিক সরঞ্জাম কেনার ঘটনা এবারই প্রথম নয় বলেও উল্লেখ করেন ওই বিশ্লেষক। তিনি ১৯৮৪ সালের সিয়াচেন সংঘাতের আগের পরিস্থিতির উদাহরণ দেন। ১৯৮৪ সালের এপ্রিলে ভারত সিয়াচেনের উচ্চভূমিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে ‘অপারেশন মেঘদূত’ শুরু করে।

ওই বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে পাকিস্তান লন্ডনের একটি সরবরাহকারীর কাছ থেকে উচ্চ-উচ্চতার যুদ্ধের সরঞ্জাম অর্ডার করেছিল। তখন তারা জানত না যে একই প্রতিষ্ঠান ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও সরঞ্জাম সরবরাহ করছিল। পরে ভারত বিষয়টি জানতে পারে এবং ১৯৮৪ সালে অপারেশন মেঘদূতের পরিকল্পনা করে।

তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়ভার মূলত পাওয়ারাসের ওপর। তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জটি পাকিস্তান বা ভারতের চেয়ে পাওয়ারাসের জন্যই বেশি। কারণ কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে—তারা দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রয়োজন মেটাতে এবং সেই সরঞ্জাম পরিচালনা করতে পারবে, কোনো পক্ষের কার্যক্রমের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না ফেলে। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক এয়ার মার্শালও ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের একই উৎস থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে।

তাঁর মতে, এই ঝুঁকি আরও বেশি, যখন দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর একজন আগে থেকেই ওই প্রযুক্তিতে এগিয়ে রয়েছে এবং তার আর্থিক সক্ষমতাও বেশি।

পাওয়ারাসের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক

পাওয়ারাসের নেতৃত্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে সহপ্রতিষ্ঠাতা জিভ মারোমকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি কাইজেন অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কাইজেন অ্যারোস্পেস বর্তমানে পাওয়ারাসের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পাওয়ারাসের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জাস্টিন গ্যানস। তিনি কোম্পানিটির মার্জারস অ্যান্ড অ্যাকুইজিশনস বা একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক সিল সদস্য।

২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গ্যানস ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শাখা এলবিট সিস্টেমস অব আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে ২০১৯ সালে অবসর নেওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেল বলেন, এ ধরনের পটভূমি সাধারণত কোনো কোম্পানিকে যাচাই-বাছাই করার সময় বিবেচনায় নেওয়া হতো। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে তিনিও নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কোনো কোম্পানির সহপ্রতিষ্ঠাতা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে কাজ করেছেন, এই বিষয়টি একটি সংবেদনশীলতার সূচক হিসেবে চিহ্নিত হতো, কোম্পানিটি আমেরিকান হলেও।

তাঁর মতে, কোনো গুরুতর সামরিক সরঞ্জাম অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে এই পটভূমি সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হতো। তবে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা স্মারকের ক্ষেত্রে এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নাও হতে পারে।

তবে কুয়া গ্রুপের প্রধান বিশ্লেষক বিলাল খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে তৈরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইসরায়েলি উপাদান থাকা পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই মেনে আসছে। তিনি বলেন, সাধারণভাবে মাঝখানে তৃতীয় কোনো দেশ থাকলে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে পাকিস্তানের তেমন আপত্তি দেখা যায় না। তবে পাকিস্তান ও ইসরায়েল সরাসরি একে অপরের সঙ্গে খুব কমই কথা বলে।

পাকিস্তানের হাতে কী আছে

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাওয়ারাস আর কার সঙ্গে কাজ করে, তার পাশাপাশি আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে। সেটি হলো, পাকিস্তানের আসলে পাওয়ারাসের কাছ থেকে কী প্রয়োজন। পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রকাশ্যে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি২ ও আকিনজি ড্রোন, চীনের তৈরি উইং লুং টু ড্রোন এবং দেশীয়ভাবে তৈরি শাহপার-টু ড্রোন প্রদর্শন করেছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা কোম্পানি গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ডিফেন্স সলিউশনসের তৈরি শাহপার ড্রোন ২০২৪ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ও সেমিনারে প্রদর্শন করা হয়। ওই প্রদর্শনীর একটি ফাইল ছবিতে শাহপার ড্রোন দেখা যায়।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির ৮০ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। চলতি মাসে পাকিস্তান বিমানবাহিনী একটি ভিডিও প্রকাশ করে জানায়, তাদের বাহিনীতে চীনের এইচকিউ-১৭এইই বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং তুরস্কের কোরকুট বিমানবিধ্বংসী কামান ও শাহিন কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা ড্রোনসহ নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলার জন্য তৈরি।

বিলাল খান বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ট্যাক্সিলা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মিলে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির কাজও করছে। কাউন্টার-ড্রোন বা সি-ইউএএস সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে এই সক্ষমতা তৈরিতে প্রচলিত এবং কার্যকর পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করছে। তাঁর মতে, পাকিস্তানের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ ড্রোনের নকশা সংগ্রহ করা নয়। বরং সেই নকশাগুলো যথেষ্ট দ্রুত এবং বড় সংখ্যায় উৎপাদন করা বা সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

রাওয়ালপিন্ডির একটি বেসরকারি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তাও পাকিস্তানের ড্রোন খাতের বিস্তারের কথা জানিয়েছেন। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তিনিও নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের ড্রোনের বাজার এখন শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেনাবাহিনীর নিজস্ব উৎপাদন স্থাপনার পাশাপাশি প্রায় এক ডজন বেসরকারি কোম্পানি এবং অর্ধডজনের বেশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ড্রোন তৈরি করছে। তাঁর মতে, পাওয়ারাসকে এসব প্রতিষ্ঠানের সবার সঙ্গে পণ্যের মানের দিক থেকে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

ঘাটতি কোথায়

তবে অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি তিন তারকা জেনারেলটির ব্যাখ্যা কিছুটা ভিন্ন। তাঁর মতে, পাকিস্তানের সমস্যা ড্রোন উৎপাদনে নয়। ঘাটতি রয়েছে ইলেকট্রনিকস, বিভিন্ন ব্যবস্থা একসঙ্গে যুক্ত করা বা ইন্টিগ্রেশন এবং সিস্টেম-লেভেল সক্ষমতায়। ঐতিহ্যগতভাবে এসব ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলো এগিয়ে। তিনি বলেন, পাওয়ারাস এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে কতটা সহায়তা করতে পারবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

পাওয়ারাসের গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টর ছোট ও কম খরচের ড্রোন। এগুলো আকাশপথে আসা অন্য ড্রোন ধ্বংস করার জন্য তৈরি। ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে।

ইসলামাবাদভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক ভিশন ইনস্টিটিউটের গবেষণা সহযোগী হাম্মাদ ওয়ালিদ বলেন, এই ধরনের ব্যবস্থা এমন একটি জায়গার ঘাটতি পূরণ করতে পারে, যেখানে প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা ব্যয়বহুল। তাঁর ভাষ্য, প্রচলিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অপেক্ষাকৃত সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। অন্যদিকে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং পরিচালনাও সহজ।

সক্ষমতা নাকি রাজনৈতিক বার্তা

প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে অভিজ্ঞ ওই অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেলের মতে, কোনো নতুন সরবরাহকারীকে সাধারণত আর্থিক, কারিগরি ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁর আগের কাজের রেকর্ডও পরীক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, এক বছরেরও কম সময় আগে প্রতিষ্ঠিত, এখনো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এবং যার কোনো সরবরাহের রেকর্ড নেই, এমন একটি কোম্পানি সাধারণত কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের জন্য প্রয়োজনীয় যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা নয়।

তাঁর মতে, এমন কোম্পানিকে সাধারণত খুবই অপরিণত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সমঝোতা স্মারকটি যদি প্রকৃতপক্ষে ক্রয়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বদলে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।

বিলাল খানও বলেন, পাওয়ারাসের সঙ্গে চুক্তিটি যেভাবে হয়েছে, তা পাকিস্তানের তিন বাহিনীর ক্রয়-সংক্রান্ত প্রধানদের সাধারণ কাজের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাওয়ারাসের সঙ্গে পাকিস্তানের এই চুক্তি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন।

ট্রাম্প মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন এবং গত ১৫ মাসে বেশ কয়েকবার তার প্রশংসা করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের গুরুত্বপূর্ণ খনিজসংক্রান্ত চুক্তি করার কয়েক সপ্তাহ পর মুনির ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে পাকিস্তানি নেতারা ট্রাম্পকে পাকিস্তানি খনিজের নমুনা উপহার দেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও সমঝোতা স্মারক সই করে। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল হলো ট্রাম্প পরিবারের প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা। বিলাল খান বলেন, পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতার বিনিময়ে দেশটি কী পাচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা। তাঁর মতে, অতীতে এ ধরনের সম্পর্কের লাভ-ক্ষতি পরিমাপ করা হতো এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মার্কিন আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে। এখন তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে ছবি তোলার আয়োজন এবং এমন কথিত চুক্তি, যেগুলো সশস্ত্র বাহিনীর জন্য কিছু বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে।

তাঁর প্রশ্ন, এসব চুক্তি পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে বাস্তবে একটি যুদ্ধক্ষম বাহিনী হিসেবে কতটা সহায়তা করছে। তবে খান নিজের ‘কম নৈরাশ্যবাদী ব্যাখ্যাও’ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানে অনেক ড্রোন স্টার্টআপ রয়েছে, যাদের নিজেদের উৎপাদন স্থাপনা তৈরির মতো পর্যাপ্ত মূলধন নেই। পাওয়ারাসের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে মার্কিন বিনিয়োগ আসতে পারে। তিনি বলেন, পাওয়ারাস এবং এর পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করলে সেই মূলধন পাকিস্তানে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে মনসুর আহমেদের মতে, পাকিস্তান শুধু একটি নির্দিষ্ট ড্রোন বা পণ্য কেনার দিকে তাকিয়ে নেই। তার ধারণা, পাকিস্তানের প্রধান আগ্রহ অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি অর্জন করা, যা একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন এবং দেশীয়করণের সুযোগ তৈরি করবে।

চীন ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেলের মতে, একটি বিদেশি বেসরকারি কোম্পানিকে নিয়ে আসার ফলে পাকিস্তানের বিদ্যমান চীনা ও তুর্কি অংশীদারত্বের সঙ্গে কিছুটা স্বার্থ সংঘাত তৈরি হতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তুরস্ক ও চীন এই উদ্যোগকে রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখতে পারে। বিশেষ করে পাকিস্তান কোনো একদিকে বেশি ঝুঁকে পড়া অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বলেও তারা মনে করতে পারে।

তবে বিলাল খান এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, তুরস্কের সঙ্গে এ নিয়ে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ তুরস্ক নিয়মিত মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করে। তাঁর মতে, পাওয়ারাস যে ড্রোনগুলো প্রস্তাব করছে, সেগুলোর সঙ্গে তুরস্কের সহযোগিতায় ন্যাশনাল অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক বা এনএএসটিপি যে ড্রোন তৈরি করছে, সেগুলোর সরাসরি কোনো মতদ্বৈততা নেই। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানে কম খরচে পাওয়ারাসের যেকোনো নকশা তৈরি করা হলেও শেষ পর্যন্ত এতে চীনা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা থাকবে।

খানের মতে, চীনের জন্য বিষয়টি আরও কম সমস্যার হতে পারে। কারণ পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যাতে পাওয়ারাসের নকশাগুলো যথেষ্ট কম খরচে নিজেদের ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারে, তার একটি উপায় হবে চীন থেকে প্রাথমিক পর্যায়ের যন্ত্রাংশ আমদানি করা।

হাম্মাদ ওয়ালিদের মতে, পাওয়ারাসের সঙ্গে এই চুক্তির কারণে চীন ও তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তিনি বলেন, ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক ও আধুনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা পাওয়ার জন্য পাকিস্তান চীন ও তুরস্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই সম্পর্ক শুধু অক্ষুণ্ন রয়েছে তা নয়, বরং এর গতিপথ ঊর্ধ্বমুখী।

সামনে কী

বিলাল খানের মতে, পাওয়ারাসের সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তির প্রকৃত পরীক্ষা হবে আগামী কয়েক মাসে। তিনি বলেন, এখনই এই চুক্তি সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া ঠিক হবে না। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিদেশি ও স্থানীয় অন্য সরবরাহকারীদের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করে কি না, তা দেখলে বোঝা যাবে পাওয়ারাসের সঙ্গে চুক্তিটি কতটা গুরুতর।

তাঁর মতে, মূল প্রশ্ন হলো সামনে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা খাতে এ ধরনের চুক্তির একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয় কি না, নাকি পাওয়ারাসের সঙ্গে করা চুক্তিটি একবারের উদ্যোগ হিসেবেই থেকে যায়।