হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজ সামলানো সেই রহস্যময় দুই পাইলট কারা, পরিচয় নিয়ে কেন লুকোচুরি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স-৮ বিমান। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটিতে ১৮২ জন যাত্রী ছিলেন। উড়োজাহাজটি হঠাৎ ভয়াবহভাবে নিচে নেমে আসার পর সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ককপিটে ছুটে গিয়েছিলেন ইউনিফর্ম পরা দুই ক্রু সদস্য। ঘটনার তিন দিন পর গতকাল শনিবার পর্যন্ত তাঁদের পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হয়নি। উড়োজাহাজটিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই দুই ব্যক্তি কে, তা নিয়ে এখনো রহস্য রয়ে গেছে।

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, ফ্লাইদুবাই তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে শুধু জানিয়েছে—তাঁরা ওই উড়োজাহাজে যাত্রী হিসেবে ভ্রমণরত দায়িত্বপালনকারী ক্রু সদস্য ছিলেন। তবে বিমান সংস্থাটি কেন এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তা স্পষ্ট নয়।

তবে উড়োজাহাজের সামনের দিকে বসে থাকা এক যাত্রী তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই দুই ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেছেন। এখনো যাঁদের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তাঁদের বীরত্বের সবচেয়ে বিস্তারিত বিবরণগুলোর একটি এটি।

উড়োজাহাজটির দ্বিতীয় সারিতে বসেছিলেন যাত্রী ড্যানিয়েল শ্লিখটার। তিনি বলেন, এটি অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি। তিনি বলেন, প্রতিটি ফ্লাইটেই যে অতিরিক্ত দুজন পাইলট থাকেন, তা নয়। এ ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল, কারণ তেল আবিব থেকে উড়োজাহাজটি আবার দুবাইয়ে ফিরিয়ে আনার কথা ছিল। তাঁরা সেখানে ছিলেন শুধু এই কারণেই।

উড়োজাহাজে দায়িত্ব পালন না করে যাত্রী হিসেবে ভ্রমণরত অবস্থায় কোনো পাইলট বা ক্রু সদস্যকে অন্য গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ডেডহেডিং।’

ককপিটে কী ঘটছিল, তা বুঝতে পেরে আতঙ্কিত যাত্রীরা চিৎকার করতে শুরু করলে ওই দুই পাইলট এগিয়ে আসেন। যাত্রীরা জানান, সহকারী পাইলট বারবার ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করছিলেন এবং চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন ককপিটের দরজার তালা খুলতে সক্ষম হন।

এরপর এক যাত্রী সহকারী পাইলটকে ধরে ককপিটের বাইরে টেনে বের করেন। অন্য যাত্রীরাও মিলে তাঁকে কাবু করার চেষ্টা করেন। শ্লিখটারের বর্ণনা অনুযায়ী, এ সময় ওই দুই পাইলটের একজন সেখানে উপস্থিত লোকজনের জটলার ওপর দিয়ে প্রায় লাফিয়ে ককপিটে ঢুকে পড়েন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন।

শ্লিখটার বলেন, তিনি আসলে ওই ব্যক্তিকে সামলানোর চেষ্টা করা লোকগুলোর ওপর দিয়ে একরকম লাফিয়ে পাইলটদের বসার জায়গায় পৌঁছে যান এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া শুরু করেন। এরপর অন্য পাইলটও যোগ দেন। তাঁরা দরজা বন্ধ করে দেন, কারণ তাঁরা চাননি সেখানে আর কেউ থাকুক।

শ্লিখটারও অন্য যাত্রীদের মতো ওই দুই ব্যক্তি কোথা থেকে এসেছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানতেন না। তবে প্রথম যিনি ককপিটে ঢুকেছিলেন, তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। শ্লিখটার বলেন, তিনি সত্যিই একজন বীরের মতো আচরণ করেছেন। উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, তিনি ঠিক বুঝতে পারছিলেন কী ঘটছে। আমার মনে হয়, ফ্লাইটে থাকা অন্য বীরদের মতো তাঁর কাছেও আমরা আমাদের জীবনের জন্য সমানভাবে ঋণী।

দুই পাইলট ককপিটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর ভেতরে কে কী করছিলেন, তা শ্লিখটার নিশ্চিতভাবে জানতেন না। উড়োজাহাজটি এতটাই ভয়াবহভাবে নিচে নেমে এসেছিল যে এর রাডারের একটি অংশ ছিঁড়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতির পর উড়োজাহাজটিকে স্থিতিশীল করতে তাঁদের বেশ কিছু সময় লাগে।

শ্লিখটারের ধারণা, এতে ‘বেশ কয়েক মিনিট’ সময় লেগেছিল, সম্ভবত ১০ মিনিট বা তারও বেশি। পাইলটেরা যখন দ্রুত অবতরণের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলেন, তখন জরুরি বিপৎসংকেত বা ‘মে ডে’ কল পাঠানো হয়।

এদিকে আতঙ্কিত ও সন্দিহান কিছু যাত্রী ওই দুই ব্যক্তিকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা ভাবতে থাকেন, এই ব্যক্তিদের বিশ্বাস করা আদৌ নিরাপদ কি না। শ্লিখটার বলেন, ‘তাঁরা উড়োজাহাজটিকে স্থিতিশীল করার পর আমাদের সঙ্গে আসলে কোনো যোগাযোগ করেননি। সত্যি বলতে, এতে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।’

তাঁর আশঙ্কা ছিল, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ওই দুই ব্যক্তি উড়োজাহাজটি ছিনতাই করে ইরান কিংবা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারেন, এমন আশঙ্কাও তাঁর মনে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, তাঁরা হয়তো উড়োজাহাজটি ছিনতাই করে ইরানে নিয়ে যেতে পারেন, কিংবা কোথায় নিয়ে যাবেন, তা-ও জানি না। কারণ, আমরা আসলে ইরান থেকে খুব বেশি দূরে ছিলাম না।’

তবে প্রায় ৪৫ মিনিট পর পাইলটেরা যাত্রীদের জানান, তাঁরা সৌদি আরবের তাবুক শহরে অবতরণ করবেন এবং সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। শ্লিখটার বলেন, সেই ঘোষণার পরই তিনি তাঁদের বিশ্বাস করার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই বিশ্বাস সঠিক প্রমাণিত হয়।