ইরানি অপারেটররা ওপেনএআই মডেল ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধের সমালোচনামূলক খবর প্রচার করছে। এমনটা করতে গিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একাধিক সংবাদমাধ্যমে এই কৌশল ব্যবহার করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ওপেনএআই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর খবরে বলা হয়েছে—ওপেনএআই তাদের ব্লগে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় এক ডজন সংবাদমাধ্যমে প্রায় ১০০টি নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। সাতজন ভুয়া সাংবাদিকের নামে এসব নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। ভুয়া পরিচালনকারীরা ফারসি ভাষায় চ্যাটজিপিটিকে নানা নির্দেশনা দিত। নিবন্ধ ও সম্পাদকীয় প্রস্তাবগুলো ঘষেমেজে নিতে তারা এ কাজ করত। সামাজিকমাধ্যমে ভুয়া মন্তব্য তৈরি করতেও এআই ব্যবহার করা হতো। এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্টগুলো ওপেনএআই ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ করেছে।
এআই দিয়ে তৈরি কিছু নিবন্ধের শিরোনাম বেশ উসকানিমূলক ছিল। যেমন—‘যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতি কি ব্যক্তি খাতের হাতে চলে যাচ্ছে? জারেড কুশনারকে নিয়ে প্রশ্ন’ এবং ‘ইরান যুদ্ধ এবং পশ্চিমের নৈতিক বিশ্বাসের ধস।’
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালানো প্রচারযুদ্ধের সাম্প্রতিক উদাহরণ এটি। এতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তরুণ ইরানিরাও মার্কিন নেতাদের ব্যঙ্গ করে এআই দিয়ে লেগো ঘরানার ভিডিও বানিয়েছিল। এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানে মার্কিন হামলার দৃশ্য দেখিয়ে এআই-নির্মিত ভিডিও পোস্ট করেছিলেন।
নিবন্ধগুলো প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমগুলোর কোনটিই প্রথম সারির মূলধারার সংবাদ মাধ্যম নয়। তবে ইন্টারনেটে তাদের বিপুল অনুসারী রয়েছে। যেমন লন্ডনের ‘মিডল ইস্ট মনিটর’ তাদের মধ্যে একটি। ফেসবুকে তাদের প্রায় ২০ লাখ অনুসারী রয়েছে। মার্কিন পাঠকদের সামনে এসব যুদ্ধবিরোধী বার্তা পৌঁছে দেওয়া তাদের একটি সফল তথ্য অভিযান বলা চলে। তবে নেপথ্যের লোকগুলো কারা তা এখনও স্পষ্ট নয়। তারা ইরান সরকারের সঙ্গে যুক্ত কি না, সে বিষয়টিও নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে ওপেনএআই।
ওপেনএআই তাদের ব্লগে লিখেছে, ‘পুরো বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনো বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর কাজ। তারা অর্থের বিনিময়ে জনমত প্রভাবিত করার প্রচারণা চালাচ্ছিল। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যুক্ত, তা আমরা শনাক্ত করতে পারিনি।’
কুশনার ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত নিবন্ধটি ছেপেছিল ‘এলএ প্রোগ্রেসিভ।’ লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘স্বাধীন ও ন্যায়বিচারকামী প্রকাশনা’ বলে দাবি করে। সিএনএন এই বিষয়ে ‘এলএ প্রোগ্রেসিভ’-এর কাছে প্রতিক্রিয়া চেয়েছে। অন্যদিকে মিডল ইস্ট মনিটরের পরিচালক দাউদ আবদুল্লাহ সিএনএনকে জানিয়েছেন, ওপেনএআই-এর চিহ্নিত করা নিবন্ধগুলো তিনি খতিয়ে দেখবেন। এরপর তিনি ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা’ নেবেন।
ওপেনএআই জানায়, নিবন্ধগুলো প্রকাশের পর ইরানি পরিচালনকারীরা চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হয়। সামাজিক মাধ্যমে এসব খবরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাধারণ মানুষের ভুয়া মন্তব্য বানাতে তারা বলত। ব্লগে বলা হয়েছে, ‘ব্যবহারকারীরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক চাল নিয়ে মন্তব্যের নির্দেশ দিয়েছিল। তারা এমন বক্তব্য চেয়েছিল যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণকারী, ইসরায়েলকে অবিশ্বস্ত মিত্র এবং ইরানকে আপসহীন কিন্তু শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানো হয়।’
জেসিকা ব্র্যান্ড ২০০৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের অফিস পরিচালনাকারী পরিচালক ছিলেন। তিনি সেখানকার সদ্য বন্ধ হওয়া ‘ফরেন ম্যালাইন ইনফ্লুয়েন্স সেন্টার’ পরিচালনা করতেন। তিনি বলেন, ‘ইরানিরা তাদের বিষয়বস্তু আসল সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে পেরেছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর। এর ফলে তাদের প্রচারণার প্রভাব আরও ছড়িয়ে পড়েছে।’
ব্র্যান্ড সিএনএনকে আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি এআই কীভাবে বিদেশি শত্রুদের গোপন হাত আড়াল করতে সাহায্য করছে। ভুয়া মুখোশগুলোকে তারা আরও নিখুঁত করছে। ফলে আসল মাধ্যমে নিজেদের প্রচার করা সহজ হচ্ছে। আর সেসব মাধ্যম ব্যবহার করে বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।’
যুদ্ধ নিয়ে মানুষের ধারণা তৈরি করতে এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের বিষয়টি ওপেনএআই-এর এই তথ্যে ফুটে উঠেছে। চলতি বছরের বসন্তে এআই দিয়ে তৈরি একটি ভুয়া মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন সামনে এসেছিল। এতে বলা হয়, চীন পরমাণু উপাদান বহনকারী একটি জাহাজ পাঠাচ্ছে। এ কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রায় জাহাজটিতে চড়াও হতে যাচ্ছিল। সিএনএন আগেই এ নিয়ে খবর প্রকাশ করেছিল।