হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

গাজায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য মেনে নিল ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

নিহত ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ গাজার রাফায় একটি গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে। ছবি: এএফপি

গাজা উপত্যকায় গত দুই বছর ধরে চলা সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে এতকাল ‘অতিরঞ্জিত’ বলে দাবি করে এলেও, অবশেষে সেই ৭০ হাজারের পরিসংখ্যানই মেনে নিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সেনাবাহিনী এখন স্বীকার করছে যে গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।

তবে এই নিহতের বিশাল অংশই যে নারী ও শিশু, সে কথাটি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন তিনি। তারপরও গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মেনে নেওয়াকে ইসরায়েলের আগের অবস্থান থেকে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৭১ হাজার ৬৬২ জন। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও নিহত হয়েছেন আরও ৪৮৮ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ আছেন হাজারো মানুষ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির ধারণা, এই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে। পাশাপাশি অবরোধ ও খাদ্যসংকটে অনাহারে মারা গেছেন অন্তত ৪৪০ জন।

তাহলে প্রকৃত নিহত-আহতের সংখ্যা কত

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিহতদের নাম ও পরিচয়পত্র নম্বর নথিভুক্ত করে হিসাব রাখছে। একই সঙ্গে আহত ও অনাহারে মৃত্যুর ঘটনাও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের হিসাবে আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭১ হাজার ৪২৮ জন। যুদ্ধবিরতির পর আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৩৫০ জন।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও এই পরিসংখ্যানকে সমর্থন দিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তুলেছে একাধিক সংস্থা।

ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত খাদ্য বিতরণকেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি।

গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা অ্যান্থনি আগুইলার বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আমি ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধাপরাধ প্রত্যক্ষ করেছি।’

আগে কী বলেছিল ইসরায়েল

যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবকে ‘ভুল’ বা ‘অতিরঞ্জিত’ দাবি করেছে ইসরায়েল। খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে গুলিবর্ষণের অভিযোগও তারা অস্বীকার করে বলেছিল, সেখানে ‘বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টি হয়ে সেনাদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি হয়েছিল। তাই গুলি চালানো হয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন, বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ ‘ব্লাড লাইবেল’ বা ইহুদিবিদ্বেষী অপবাদ।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি দাবি করেন, আধুনিক নগরযুদ্ধের ইতিহাসে বেসামরিক ও যোদ্ধা নিহতের সবচেয়ে কম অনুপাত ইসরায়েলের, যেখানে প্রতি একজন যোদ্ধার বিপরীতে একজন বেসামরিক নিহত হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্টে ফাঁস হওয়া একটি সামরিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় নিহতদের ৮০ শতাংশের বেশি বেসামরিক।

ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সাময়িকী +৯৭২-এর এক অনুসন্ধানে উঠে আসে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ‘ল্যাভেন্ডার’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর টার্গেটিং সিস্টেম হাজার হাজার গাজাবাসীকে সম্ভাব্য যোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা উপযোগী লক্ষ্য বানিয়েছিল।

সংখ্যার ওঠানামা

৭ অক্টোবর হামলায় প্রথমে ইসরায়েল নিহতের সংখ্যা বলেছিল ১ হাজার ৪০০। পরে তা কমিয়ে ১ হাজার ১৫০-এর নিচে আনা হয়। এমনকি ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ওই দিন নিহতদের মধ্যে কেউ কেউ ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতেও মারা যেতে পারেন।

গাজায় নিহত যোদ্ধার সংখ্যাও ইসরায়েল বারবার বদলেছে—২০২৩ সালের নভেম্বরে ২০ হাজার বলার পর ডিসেম্বরে তা ৭ হাজার ৮৬০, ২০২৪ সালের আগস্টে ১৭ হাজার, দুই মাস পর আবার ১৪ হাজার বলা হয়।

পশ্চিমা মিত্র ও অনেক পশ্চিমা গণমাধ্যমও দীর্ঘ সময় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, ‘কতজন নিহত হয়েছে সে বিষয়ে ফিলিস্তিনিদের দেওয়া তথ্যে আমার আস্থা নেই। এ নিয়ে কে সত্য বলছে—এমন কোনো ধারণাও আমার নেই।’

এত দিন পর কেন স্বীকার করল ইসরায়েল

দোহার হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক সুলতান বারাকাত আল জাজিরাকে বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ে বাড়তি উপস্থিতি এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা পুরোপুরি অস্বীকার করা ইসরায়েলের জন্য আর সম্ভব হচ্ছিল না।

তিনি আরও বলেন, এই সংখ্যা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ‘গণহত্যা হয়েছে কি না’ সে প্রশ্ন থেকে সরে পুনর্গঠন ও দায় কার—সে দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।

বারাকাতের মতে, এর আইনি দিকও আছে। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্বীকার করা মানেই দায় স্বীকার নয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ার জন্য একটি তুলনামূলক সুসংগত নথি তৈরিতে এটি কাজে আসতে পারে।

পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রাজাবের গাড়িতে ট্যাংক থেকে গুলি করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

অস্বীকারের পুরোনো নজির

গাজা ও পশ্চিম তীরে শিশু ও সাংবাদিক হত্যার অভিযোগও শুরুতে অস্বীকার করেছিল ইসরায়েল। পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রাজাবের গাড়িতে ট্যাংক থেকে গুলি চালানোর অভিযোগ প্রথমে নাকচ করা হয়। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, গাড়িটিতে ৩০০টির বেশি গুলি লাগে এবং ইসরায়েলি বাহিনী কাছেই অবস্থান করছিল। এখন মামলাটি তাদের নিজস্ব তদন্ত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনায় আছে।

২০২২ সালে জেনিনে সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ নিহত হওয়ার পরও প্রথমে বলা হয়েছিল তিনি ক্রসফায়ারে পড়েছেন। পরে ইসরায়েল স্বীকার করে, তাদের কোনো সেনার গুলিতেই তিনি নিহত হয়ে থাকতে পারেন এবং একপর্যায়ে সামরিক মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি বলেন, ‘শিরিন আবু আকলেহর মৃত্যুর জন্য আমরা খুবই দুঃখিত।’

২০২৫ সালে রাফাহ এলাকায় ১৫ জন জরুরি সেবাকর্মী নিহতের ঘটনাতেও প্রথমে ‘সন্দেহজনক গতিবিধি’র কথা বলা হলেও পরে সেটিকে ‘পেশাগত ভুল’ ও ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ বলে বর্ণনা করে ইসরায়েলি বাহিনী।

২০২২ সালে জেনিনে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন আল জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ। ছবি: এএফপি

কেন এমন অস্বীকার

সুলতান বারাকাতের মতে, ‘তথ্যযুদ্ধ প্রতিটি সংঘাতেই বাস্তব বিষয়। তবে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল হিসেবে দেখা যায়, যাতে স্বাধীন যাচাই কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি মনে করেন, শুরুর দিকে অস্বীকারের বিষয়কে সাধারণত ‘অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের প্রয়োজন’ বলে উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতগুলোতে সম্ভাব্য মামলার ঝুঁকিও বিবেচনায় থাকে।

সুলতান বারাকাত বলেন, ‘প্রথমেই দায় বা বড় সংখ্যা মেনে নিলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মামলাগুলোতে প্রভাব পড়তে পারত। দেরিতে স্বীকার করে তারা আইনি ঝুঁকি ও মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের সময় পেয়েছে।’

আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

বুলেটের বদলে বই—সিরিয়ার শিশুদের মুখে হাসি ফেরাচ্ছে ‘সাংস্কৃতিক বাস’

মার্কিন হামলা হলে এবার ইরানের প্রতিক্রিয়া কেন ভিন্ন হতে পারে

সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হচ্ছে বিদ্রোহী কুর্দিরা, চুক্তি স্বাক্ষর

ইরানে কমান্ডো অভিযানের কথাও ভাবছেন ট্রাম্প

আধিপত্য নয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তা চুক্তি: তুরস্ক

ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের টেলিকনফারেন্সের প্রস্তাব এরদোয়ানের

প্রয়োজনে ইরান থেকে নিজেদের বিজ্ঞানীদের সরিয়ে নিতে প্রস্তুত রাশিয়া

ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জে’র পরিস্থিতি তৈরিতে সুপরিকল্পিত হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প

ট্রিগারে আঙুল রাখা আছে—ট্রাম্পের ‘ভয়াবহ হামলার’ হুমকির জবাবে ইরান

ট্রাম্পের ‘ভয়াবহ হামলার’ হুমকিতে ভীত নয় ইরান, শক্তিশালী জবাবের ঘোষণা