ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার পর গাজা ও ইসরায়েল উভয় জায়গায়ই উল্লাস ও আনন্দের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের মানুষই এখনো শঙ্কিত।
বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার রাতে মিসরের শার্ম আল শেখ শহরে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর ঘোষণা দেন—ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে সম্মত হয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিকল্পনার আওতায় হামাসের হাতে আটক সব বন্দীকে মুক্ত করা হবে এবং ইসরায়েলি সেনারা একটি নির্ধারিত সীমারেখা পর্যন্ত সরে যাবে।
কাতারের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই চুক্তি যুদ্ধের অবসান, জিম্মি ইসরায়েলিদের মুক্তির বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি এবং গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত করবে।
তবে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনিশ্চিত রয়ে গেছে—বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা এবং আবার যুদ্ধ শুরু ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
জানা গেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইসরায়েলের তেল-আভিভের ‘হোস্টেজেস স্কয়ার’-এ শত শত মানুষ আনন্দে ভাসে, উচ্ছ্বাস। দীর্ঘদিন হামাসের হাতে বন্দী থাকা প্রিয়জনদের ফেরার আশায় তারা গান গায়, আলিঙ্গন করে এবং কাঁদতে কাঁদতে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানায়। সাবেক বন্দী ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। হিলেল মায়ার নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমাদের হৃদয় আনন্দে ভরে গেছে।’
এদিকে গাজার খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে ভোররাতে হাজারো মানুষ আনন্দ প্রকাশ করে। স্থানীয় বাসিন্দা খালেদ শাত বলেন, ‘এটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।’ এক কিশোরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা টানা দুই বছর যুদ্ধের মধ্যে আছি। এবার হয়তো ঘরে ফিরতে পারব।’
তবে একই সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে—তারা যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরব মুখপাত্র আভিখাই আদ্রিয়ি গাজার মানুষকে সতর্ক করেছেন—তারা যেন গাজার উত্তরে ফিরে না যায় এবং সেনা অবস্থানগুলোর কাছে না ঘেঁষে। গাজার সাংবাদিকেরা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় এখনো ইসরায়েলি হামলা চলছে।
ইসরায়েলে বন্দীদের পরিবারগুলো যেমন আনন্দে আত্মহারা, তেমনি শঙ্কিতও। কারণ তাঁদের মনে অতীতের চুক্তিগুলো ভেস্তে যাওয়ার স্মৃতি এখনো তরতাজা। সাবেক জিম্মি এলিয়া কোহেন বলেছেন, ‘যতক্ষণ না তারা (হামাসের হাতে জিম্মিরা) রেড ক্রসের গাড়িতে চড়ে আমাদের সেনাদের সঙ্গে দেখা করছে, আমরা শুধু প্রার্থনাই করে যাব।’
গাজায় মানুষেরাও ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁরা বলেছেন—যুদ্ধ থামাতে যে-ই সামান্য ভূমিকা রাখুক না কেন, তিনি আমাদের কাছে কৃতজ্ঞতার পাত্র।
খান ইউনুসের ওয়েল রাদওয়ান ও আবদুল মজিদ আবদ রব্বো বলেন, ‘পুরো গাজা এখন খুশিতে ভরপুর। আরব দুনিয়া, এমনকি গোটা বিশ্বই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে।’ তবে গাজা কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে—মানুষ যেন সরকারিভাবে নিশ্চিত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিশ্চিন্ত না হয় এবং চলাচলে সতর্কতা বজায় রাখে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির এই ঘোষণাটি এল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের আক্রমণের দুই বছর পূর্তির ঠিক একদিন পর। হামাসের হামলায় সেদিন অন্তত ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসা হয়েছিল। এদের মধ্যে কয়েক দফায় জিম্মিদের মুক্তির পর এখনো গাজায় ৪৮ জন রয়ে গেছেন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে গাজায় ২০ জিম্মি জীবিত আছেন।
তবে টানা দুই বছর ধরে ইসরায়েলের হামলায় গাজার চিত্র এখন শোচনীয়। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন—যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। জাতিসংঘের এক স্বাধীন তদন্তে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো বলা হয়, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে। তবে ইসরায়েল সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।