হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

বিবিউড: ফ্লাইদুবাইয়ের ঘটনা নিয়ে নেতানিয়াহুকে ঘিরে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স-৮ বিমান। ছবি: এএফপি

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান পরিবহন সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ের একজন কো–পাইলট বা সহকারী পাইলট তেল আবিবগামী একটি বিমান ক্র্যাশ করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্টারনেটে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই বিষয়টিকে ‘বিবিউড’ (Bibiwood) আখ্যা দিয়ে সরকারি তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

গত সপ্তাহের বুধবারের দুবাই থেকে তেল আবিবগামী এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে এই ঘটনাটি ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নানা গুজব ছড়াতে শুরু করে। কেউ কেউ বলছেন, এতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে। আবার কারও মতে, এমন কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে উঠে এসেছে ঘটনা ঘটার সময়টি। সামনেই ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন। এ ছাড়া বিমানের নম্বর, যাত্রীদের ভিডিও এবং পরে যাত্রীদের সাথে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাক্ষাৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওমানের ওই সহকারী পাইলট জরুরি কাজের একটি কুড়াল নিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করেন। তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে পরে যাত্রী ও ক্রুরা মিলে তাঁকে আটকে ফেলেন।

গত সোমবার রয়টার্স তদন্তের সঙ্গে যুক্ত দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার কথা উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ওই কো–পাইলট আমিরাতের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, ফ্লাইদুবাইতে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।

‘বিবিউড’ বিষয়টি কী?

বিবিউড শব্দটি এসেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডাকনাম ‘বিবি’ এবং ‘হলিউড’ শব্দ থেকে। ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের কোনো সাজানো নাটক বা রাজনীতি আছে—এমনটা বোঝাতে সমালোচকেরা এই শব্দ ব্যবহার করছেন।

তবে এসব গুজবের ধরণ বিভিন্ন রকম। অনেকের মতে, এটি ইসরায়েলের একটি সাজানো নাটক বা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাওয়া কিংবা ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে লাভবান হতেই এটি করা হয়েছে। ঘটনার পর নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অভিযোগ উঠেছে। তিনি ফিরে আসা যাত্রীদের প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরেন। একই সাথে তিনি নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে নিজের আগের সতর্কবার্তার কথা মনে করিয়ে দেন।

ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ নেতানিয়াহুর সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘সস্তা রাজনীতি’র অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, আমিরাত সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটি যুক্তির চেয়েও রাজনৈতিক নির্বাচন দ্বারা বেশি চালিত হচ্ছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোও নেতানিয়াহুর আচরণের সমালোচনা করেছে। টাইমস অব ইসরায়েল এই ঘটনাকে প্রচারণার এক সহজ সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এসব গুজবের ভিত্তি কী?

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারীরা বিমানের ভেতরের ভিডিওগুলো খুব মন দিয়ে দেখেছেন। সেখানে তারা কিছু অসংগতি পাওয়ার দাবি করেছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বিমানটি দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ার পরও কেন অক্সিজেন মাস্ক ঝুলতে দেখা গেল না? আবার অনেকে বলছেন, যাত্রীদের কেন এত শান্ত দেখাচ্ছিল এবং কেন জিনিসপত্র সব সোজাভাবে রাখা ছিল?

যাত্রীদের দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহ জেগেছে। বিশেষ করে যারা হামলাকারীকে আটকে ককপিট উদ্ধার করতে সাহায্য করেছিলেন, তাদের কথা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঘটনার শুরুতে স্পষ্ট তথ্যের অভাব থাকায় মানুষ আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম বিস্তারিত নাটকীয় খবর দিলেও, ফ্লাইদুবাই প্রথমে খুব সামান্য তথ্য দিয়েছিল। তারা শুধু বলেছিল বিমানে একটি ঘটনা ঘটেছে এবং তদন্ত চলছে।

পরে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পুরো তথ্য দিয়ে জানানো হয় যে সত্যিই হামলা হয়েছিল এবং হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের নাম প্রকাশ করা হয়। বিমানে বাড়তি দুইজন ফ্লাইদুবাই পাইলটের উপস্থিতি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। তারাই মূল হামলাকারীকে আটকানোর পর বিমান চালিয়ে নিয়ে যান। তবে জানা গেছে, তারা ডিউটির খাতিরে যাত্রী হিসেবে ওই বিমানে অন্য জায়গায় যাচ্ছিলেন।

ককপিটের দরজা কীভাবে খোলা হলো তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার জানান, সহকারী পাইলটের কাছে নিয়ন্ত্রণ থাকার সময় বাইরের ক্রুরা ঢুকতে পারছিলেন না। পরে তিনি নিজেই ভেতরের সুইচ চেপে দরজা খুলে দেন এবং অন্যদের ঢোকার সুযোগ করে দেন।

এর মধ্যে বিবিসির লোগো দেওয়া একটি ভুয়া ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, এতে ইসরায়েলি সংস্থা মোসাদ এবং ভারতীয় গোয়েন্দারা জড়িত ছিল। শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীরাই নন, অন্যরাও সরকারি বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

যুক্তরাজ্যের এমপি আইয়ুব খান তদন্তের তথ্য এত দ্রুত সামনে আসা নিয়ে প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল এত দ্রুত সব তথ্য কীভাবে পেয়ে গেল তা দেখে তিনি সত্যি অবাক হয়েছেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, এখানে সন্দেহজনক কিছু লুকিয়ে আছে।

এই ঘটনাটি নেতানিয়াহুর প্রতি মানুষের অসন্তোষ এবং গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার বিরোধিতার সাথেও জুড়ে গেছে। সমালোচকেরা বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েলের আগের মিথ্যাচারের কথা তুলে ধরছেন। আমিরাত কর্তৃপক্ষ এখনো ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। হামলাকারীর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তার সাথে আর কারও যোগসাজশ আছে কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।