লোহিত সাগর অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব চুক্তি বাতিল করেছে সোমালিয়া সরকার। গতকাল সোমবার মোগাদিসু সরকার এই ঘোষণা দিয়ে পারস্য উপসাগরীয় দেশটিকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ও প্রধান বন্দর অবকাঠামো থেকে বহিষ্কার করেছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
সোমালিয়া সরকারের এক উচ্চপদস্থ সূত্র এবং মিডল ইস্ট আইয়ের দেখা নথি অনুসারে, মোগাদিসু সরকারের এই পদক্ষেপের আওতায় আমিরাতের সরকারি সংস্থা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক প্রশাসনের সঙ্গে করা সব চুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নথিতে বলা হয়েছে, ‘এই সিদ্ধান্ত বারবেরা, বোসাসো এবং কিসমায়ো বন্দরের সব চুক্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। মন্ত্রিপরিষদ সোমালিয়া ফেডারেল সরকার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিসহ সব চুক্তি বাতিল করেছে।’
এতে আরও বলা হয়েছে, ‘দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে নেওয়া গুরুতর পদক্ষেপের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ অনেক সোমালি নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। সাংবাদিক ইসহাক এলমি বলেন, ‘এটি সঠিক দিকের একটি পদক্ষেপ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে বড় শত্রু সোমালিয়ার আর নেই।’
২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট থাকা মোহাম্মদ আবদুল্লাহি ফারমাজোও এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
অন্যদিকে সোমালিল্যান্ড সরকারের মন্ত্রী খাদের হোসেন আব্দি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সোমালিয়ার দিবাস্বপ্ন কিছুই পরিবর্তন করতে পারবে না। বারবেরা আমাদের প্রেসিডেন্টের জন্মস্থান এবং আরব আমিরাত সোমালিল্যান্ডের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু। অন্যরা যখন আমাদের নিয়ে সন্দেহ করেছিল, তারা তখন এখানে বিনিয়োগ করেছে...মোগাদিসুর দুর্বল প্রশাসন যা-ই বলুক না কেন, আমিরাত এখানে ছিল এবং থাকবে।’
সোমবার মিডল ইস্ট আই জানায়, আরব আমিরাত সোমালিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে তাদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের বোসাসো শহরও রয়েছে, যেখানে একটি আমিরাতি ঘাঁটি ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘাঁটি থেকে সুদানের আধা সামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’-এর কাছে রসদ পাঠানো হতো। সোমালিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তারা তাদের নিরাপত্তাকর্মী এবং সামরিক সরঞ্জাম প্রতিবেশী ইথিওপিয়ায় সরিয়ে নিচ্ছে।’
পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের প্রশাসন মোগাদিসু সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। এর কারণ হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তার আঞ্চলিক মিত্র ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করছে, যা সোমালিয়ার একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল এবং যেখানে নিজস্ব সরকার রয়েছে।
গত ২৬ ডিসেম্বর ইসরায়েল বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়। এডেন উপসাগর উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বারবেরা এই অঞ্চলেই অবস্থিত। গত মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার প্রথম সরকারি সফরে এই শহরে যান। সফরকালে সার ঘোষণা করেন, ‘ফিলিস্তিনের মতো সোমালিল্যান্ড কোনো ভার্চুয়াল রাষ্ট্র নয়’ এবং এই সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশকে ‘পাশ্চাত্যপন্থী ও ইসরায়েলের বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন।
ইসরায়েল এবং সোমালিল্যান্ডের মধ্যে আলোচনায় বারবেরায় একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই শহরটি বর্তমানে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে আরব আমিরাতের নিয়ন্ত্রিত ঘাঁটি বলয়ের একটি অংশ।
এরপর গত বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের দক্ষিণপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আইদারুস আল-জুবাইদিকে বহনকারী একটি জাহাজ বারবেরায় নোঙর করে, যাকে আরব আমিরাত সমর্থন দিয়ে থাকে। সৌদি আরব তখন তাদের নামমাত্র মিত্র আমিরাতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, তারা জুবাইদিকে ইয়েমেন থেকে বারবেরা বন্দর হয়ে কৌশলে আবুধাবিতে নিয়ে গেছে।
সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে আরব আমিরাতের সম্পর্ক ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয়, যখন সোমালিল্যান্ড সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের আমিরাতি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারা আশা করেছিল, এই সম্পর্ক তাদের স্বাধীনতার দাবিকে শক্তিশালী করবে। মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বারবেরায় এই আমিরাতি নৌঘাঁটিটি একটি থমকে থাকা প্রকল্প থেকে প্রায় সম্পন্ন একটি স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে। এখানে আধুনিক সামরিক বন্দর, গভীর সমুদ্রের ডক, হ্যাঙ্গারসহ একটি বিমানঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে।
বারবেরার রানওয়েটি ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা আফ্রিকার অন্যতম দীর্ঘতম রানওয়ে। একসময় নাসা এটি মহাকাশ যানের জরুরি অবতরণ ক্ষেত্র হিসেবে ভাড়ায় নিয়েছিল। এর মানে হলো, এখান থেকে ভারী পরিবহন বিমান এবং যুদ্ধবিমান অনায়াসেই ওঠানামা করতে পারবে। বারবেরা বন্দরটি ২০২২ সাল থেকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে এবং এর যৌথ মালিকানায় রয়েছে আমিরাতের লজিস্টিক জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ড, সোমালিল্যান্ড সরকার এবং ব্রিটিশ সরকার (তাদের বিদেশি বিনিয়োগ শাখা বিআইআইয়ের মাধ্যমে)।