যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টায় নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়ন নিয়ে গতকাল বুধবার কাতারের রাজধানী দোহায় পরোক্ষ টেকনিক্যাল বা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।
আলোচনার পর ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ঘোষণা দেন, সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট বিষয় জানাতে তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি ‘যোগাযোগ চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠা করবে। তাঁর ভাষ্য, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার পর উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
দোহার বৈঠকে মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর বিভিন্ন লঙ্ঘনের মধ্যেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর সময়সূচি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সমঝোতা স্মারকের ব্যাখ্যা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এর জেরে গত এক সপ্তাহে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা হয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে আংশিকভাবে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে।
বুধবার দোহায় কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। পরে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে জানান, সমঝোতা স্মারক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে।
মাজেদ আল-আনসারি বলেন, দুই পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হবে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা ৪ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আশাবাদ প্রকাশ করেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের অ্যাডাম ক্যানক্রিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দোহার আলোচনা ‘ভালোভাবে এগোচ্ছে’ এবং শিগগিরই পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।
ভ্যান্স বলেন, প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচকেরা ইরানি ও কাতারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং এখন আলোচনার মূল উদ্বেগের বিষয় পারমাণবিক প্রশ্ন। তবে পরে ভার্জিনিয়ার ভার্জিনিয়া বিচ সফরে সাংবাদিকদের তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী মাসে সমঝোতা স্মারকের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র আর সামরিক পদক্ষেপ নেবে না, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। কারণ, শেষ পর্যন্ত ইরান কী করবে, তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে। তবে প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন ছাড়া আবার সেনাবাহিনী পাঠাবেন না। স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকলেই তা করা হবে।’
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসরায়েলের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল নতুন হামলা চালালে ইরান ‘তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব’ দেবে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানান।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। কাজেম গারিবাবাদি জানান, জব্দ অবস্থায় থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার সম্পদের একটি অংশ তেহরানের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য ব্যবহার করা হবে। তিনি বলেন, কাতারি কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে এই অর্থের একটি অংশ ব্যয়ের বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গারিবাবাদির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা হবে এবং সেগুলো দেশটিকে সরবরাহ করা হবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কেনার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা যাবে।
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৩৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং জাহাজ চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক কমান্ডার বুধবার আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সেখানে হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। একই দিনে আরব সাগরে একটি এমএইচ-৬০ এস সি হক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর নিখোঁজ এক বিমানকর্মীকে খুঁজতে অভিযান শুরু করে মার্কিন নৌবাহিনী। দুর্ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি।
অন্যদিকে বুধবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরানের অনুমোদিত রুট ব্যবহার না করায় একটি বিদেশি কনটেইনারবাহী জাহাজ আটকে গেছে। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) প্রতিবেদনে বলা হয়, কম গভীরতার জলপথ বেছে নেওয়ায় জাহাজটি আর যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বার্তা তুলে ধরতে চাইছে তেহরান।
দিনের শেষ ভাগে দোহায় কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হাম্মাদ আল সানি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
পরে ট্রাম্পও আলোচনার অগ্রগতিকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে প্রথম সফরের প্রস্তুতিকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘খুব ভালো বৈঠক হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগোচ্ছে। আমরা তাদের খুব কঠোরভাবে আঘাত করেছি, কিন্তু এখন আমরা ভালোভাবে এগোচ্ছি।’
আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় আশাবাদ তৈরি হওয়া এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমে যাওয়ায় বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।