হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ, আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎকেন্দ্র–সেতুতে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও দ্রুত উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার ইরানের সব বন্দর ঘিরে নৌ অবরোধ (নেভাল ব্লকেড) পুনর্বহাল করেছেন এবং তেহরান আলোচনায় ফিরে না এলে আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করেছে বলে জানিয়েছে, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য ব্যবহৃত ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করা।

এদিকে তেহরানের দাবি, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও শত্রুতা শুরু হওয়ার পর তারা পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে জুন মাসে কয়েক মাসব্যাপী সংঘাতের পর যে নাজুক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ওই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি জ্বালানি-সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোকে আপাতত শেষের জন্য রেখে দিচ্ছেন, তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলোতেও হামলা চালানো হবে। তিনি আরও বলেন, আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা হবে, যদি না ইরান আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে এবং আলোচনা শুরু করে।

তবে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশনে যুদ্ধকালীন মানবিক আচরণবিষয়ক বিধানে বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ট্রাম্প আরও জানান, মার্কিন আলোচকরা তাঁদের ইরানি সমকক্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সতর্ক করেছেন যে, চুক্তিতে পৌঁছানোই তাদের জন্য উত্তম হবে।

জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের পাল্টা হামলার দাবি

আজ বুধবার ভোরে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা জর্ডানের আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন অবস্থানগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অস্ত্র ও সামরিক সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, একটি অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে রয়টার্স এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা

গত কয়েক দিনের সংঘাত বৃদ্ধির ফলে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) আদৌ যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটাতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ ইতোমধ্যেই ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে জড়িয়ে ফেলেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বন্দর আব্বাসের গভর্নরের কার্যালয় জানায়, মঙ্গলবার গভীর রাতে হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত বন্দর আব্বাস শহরের আশপাশে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানায়, দক্ষিণ ইরানের সিরিক এলাকার কাছেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে সামরিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং চাপ বাড়িয়ে ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা যাবে, তবে তারা ভুল করছে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার গভীর রাতে অভিযোগ করে, গত এক সপ্তাহে ইরান সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এতে প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ অথবা আহত হয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে দুটি আমিরাতি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় দুটি "অপরাধী" সুপারট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেওয়া হয়েছে। তবে জাহাজ দুটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।

ট্রানজিট ফি থেকে সরে এলেন ট্রাম্প

উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সোমবার ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ট্রানজিট ফি আরোপের ধারণা দিয়েছিলেন। জাতিসংঘের শিপিং সংস্থা এবং বিভিন্ন পক্ষ এ প্রস্তাবের সমালোচনা করে। গতকাল মঙ্গলবার তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বলেন, এর পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করার চেষ্টা করবেন। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা বা বাংলাদেশ সময় রাত ২টা থেকে পুনরায় কার্যকর হয়েছে। জুন মাসে এই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরানের জাহাজ ছাড়া অন্য সব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই অঞ্চলে ২০ টিরও বেশি মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে।

জ্বালানি বাজারে চাপ, যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। দেশটিতে পেট্রোলের দাম বেড়েছে এবং নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত সাত দিনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা জুনের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ।

ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। পরে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালালে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশও এতে জড়িয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এখন পর্যন্ত জ্বালানি সংকট মোটামুটি সামাল দিতে সক্ষম হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত মাসে সতর্ক করে বলেছিল, যুদ্ধ যদি জুলাইয়ের মাঝামাঝির পরও চলতে থাকে, তাহলে তা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। বিশেষ করে, ভোক্তাদের ওপর প্রভাব কমাতে বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই তাদের কৌশলগত তেলের মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। রয়টার্সের এক জনমত জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেক উত্তরদাতা মনে করেন, এই যুদ্ধের মূল্য তার অর্জনের তুলনায় যথার্থ নয়।

কেশম দ্বীপে হামলার দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তেহরানের

ইরান মঙ্গলবার জানায়, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন নৌঘাঁটির আতিথ্যদানকারী বাহরাইন জানিয়েছে, তারা একটি ইরানি আকাশপথের হামলা প্রতিহত করেছে। এছাড়া উপসাগরীয় আরও কয়েকটি দেশও হামলার মুখে পড়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপের গভর্নরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা প্রায় ৭টার দিকে দ্বীপটিতে একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

ওয়াশিংটন বারবার বলছে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। যদিও তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি দিতে হবে। ট্রাম্প আরও বলেন, কয়েকটি দেশ, যেগুলোর নাম তিনি প্রকাশ করেননি, তাঁকে জানিয়েছে যে তারা ট্রানজিট ফি দেওয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে কোন উপসাগরীয় দেশ কী ধরনের বিনিয়োগে সম্মত হয়েছে, আদৌ কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেননি।

নেতানিয়াহুকে সিরিয়া-লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নিতে বলেছেন ট্রাম্প

হরমুজে টোল দিতে রাজি উপসাগরীয় দেশগুলো, তবে ইরানকে নয়

হরমুজের পর এবার ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালি’ বন্ধের ইঙ্গিত ইরানের

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সংঘর্ষ

ট্রাম্পের নজরে এবার ইরানের গোপন ‘কুহ-ই-কলাং’

হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির হামলায় ট্রাম্পের সমর্থন, ৪ বছর পর ফের যুদ্ধের শঙ্কা

আবারও ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের, আজই কার্যকর

গাজায় ইসরায়েলি পারমাণবিক বোমা হামলার আশঙ্কা সিনওয়ারের, নথি প্রকাশ

আমিরাতের সেরা শিক্ষার্থীদের চমক দিলেন দুবাই শাসক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যেই তেহরানে রাশিয়ার ‘কেয়ামতের বিমান’—বাড়ছে রহস্য