সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী হামলা ও বিমানবন্দরের অচলাবস্থা কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটই তৈরি করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক দশকে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩ শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা হুতিদের বিমানবন্দরকে মূল লক্ষ্যবস্তু বানানোর নেপথ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন।
হুতিরা তাদের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার জবাবে সরাসরি বদলা বা ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিগুলোতে সৌদি জোটের হামলায় হুতিদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এবার হুতিরা বার্তা দিচ্ছে— ইয়েমেনের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর অবরুদ্ধ থাকলে রিয়াদ বা সৌদি আরবের কোনো বেসামরিক বিমানবন্দরও নিরাপদ থাকবে না (Airport for Airport)। রিয়াদ বিমানবন্দরকে অচল করে তারা সৌদি সরকারের সঙ্গে যেকোনো ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা বা যুদ্ধবিরতিতে নিজেদের দর–কষাকষির শক্তি (নেগোসিয়েশন কার্ড) বাড়াতে চাইছে।
সৌদি আরবকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করাও হুতিদের প্রধান কৌশল। আগে তেল শোধনাগার (যেমন আরামকো) তাদের লক্ষ্যবস্তু হলেও, এবার শুধু বিমানবন্দরকে বেছে নেওয়া হয়েছে দেশটির অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানতে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক এফ. গ্রেগরি গজের মতে, বিমানবন্দর অচল হলে বা বিশ্বজুড়ে ফ্লাইট বাতিল হলে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বিনষ্ট করতেই এই পদক্ষেপ, যাতে তারা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ বা আসন্ন মেগা সামিট ও বিনিয়োগ সম্মেলনে আসার আগে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়।
আন্তর্জাতিক নজর কাড়ার জন্য বিমানবন্দরের চেয়ে বড় কোনো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না। বিমানবন্দরগুলোতে বিভিন্ন দেশের নাগরিক, ওমরাহ যাত্রী এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা যুক্ত থাকে। ফলে একটি সফল হামলাই বিশ্বজুড়ে শিরোনাম তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিমান চলাচলে সতর্কতা জারি করায় এবং বিশ্বখ্যাত এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইট স্থগিত করায় বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন খাতে হুতিরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ইয়েমেনি সরকার ও সামরিক অভিযানকে রিয়াদের সমর্থন জোগানোর মূল্য যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সরাসরি সৌদি সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হুতিদের অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। রাজধানী রিয়াদে সাইরেন বা আগাম সতর্কতা ছাড়া বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চাইছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো থমাস ওয়ারিকের মতে, হুতিদের এই সামরিক আচরণ ইরানের আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। সমুদ্রপথে মার্কিন ও সৌদি নৌবাহিনীর নজরদারির কারণে অস্ত্র পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়, হুতিরা বিমানপথ ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে গোটা গলফ বা উপসাগরীয় অঞ্চলকে উত্তপ্ত ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য ব্যয়বহুল করে তুলছে।
তথ্য: আল জাজিরা ও দ্য উইক