সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী আজ সোমবার বাব এল–মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অবস্থান দখল করেছে। সামরিক ও সরকারি সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। গত মাসে ইরান-সমর্থিত হুতিরা যেসব এলাকায় অগ্রসর হয়েছিল, সেসব এলাকা পুনর্দখল করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ থেকে সরিয়ে দিতে সরকারি বাহিনী লড়াই করছে।
তিন সামরিক কর্মকর্তা ও এক সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সরকারি বাহিনী বাব এল–মান্দেব প্রণালির দিকে নজর রাখা ধুবাব জেলার বড় একটি অংশ দখল করেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ব্যাপক বিমান সহায়তায় তারা ওই এলাকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর আগে হুতিপন্থী গণমাধ্যম সরকারি বাহিনীর ওই এলাকায় অগ্রসর হওয়ার খবর অস্বীকার করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনে ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে তীব্র লড়াই চলছে। দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা স্থবির থাকা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ বাব এল–মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি এরই মধ্যে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ইয়েমেনে লড়াই শুরু হওয়ায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি পথও হুমকির মুখে পড়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং এমন একটি অঞ্চলে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যেখানে এরই মধ্যে ব্যাপক সংঘাত চলছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার গতকাল রোববার জানিয়েছে, হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলের জন্য তারা সামরিক অভিযান শুরু করেছে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি বলেছেন, দেশকে ‘সন্ত্রাসী মিলিশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত’ না করা পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া সৌদি আরব এই সামরিক অভিযানে বিমান সহায়তা দিচ্ছে। হুতিদের পিছু হটাতে সৌদি আরব তার মিত্রদের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও লজিস্টিক সহায়তাও চেয়েছে। এর লক্ষ্য হলো লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা বন্ধ করা।
ইয়েমেনের বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্টে সংঘাত চললেও সবচেয়ে তীব্র লড়াই হচ্ছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। এর মধ্যে রয়েছে বাব এল–মান্দেব প্রণালির কাছের উপকূলীয় এলাকা এবং তাইজ শহরের আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে হুতিরা সরকারি বাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।
হুতি-নিয়ন্ত্রিত এক সংবাদ সংস্থা সোমবার এক সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, হুতি যোদ্ধারা তাইজ প্রদেশের আল-মাওয়াসিত জেলা থেকে সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে দিয়েছে। তারা ইয়েমেনের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান আল-আলিমির বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
পাহাড়ি এই জেলাটি তাইজ থেকে এডেন যাওয়ার প্রধান সড়কের কাছে অবস্থিত। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাইজ শহরটি যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে। সরকারি বাহিনীর জন্য শহরটিতে প্রবেশের এটিই ছিল সর্বশেষ সড়কপথ।
ইয়েমেনে বর্তমান সংঘাতের শুরু ২০১৪ সালে। ওই বছর হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। এর পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনের সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া। জোটটি এ লক্ষ্যে বিমান হামলা শুরু করে।
তবে যুদ্ধ দ্রুতই রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় পরিণত হয়। ইয়েমেনের বেশির ভাগ যুদ্ধফ্রন্টে দীর্ঘদিন কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি। এর ফলে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। এমনিতেই ইয়েমেন ছিল আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। চলতি গ্রীষ্ম পর্যন্ত সেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল।