হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

হামাসকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ করলেও গাজায় কাতারের অর্থছাড়ে সহায়তা করে ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

গাজার একাধিক জায়গায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ফাইল ছবি

সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু গোপন নথিপত্রে দেখা গেছে, গাজা উপত্যকায় কাতার যে অর্থ পাঠাত, তাতে সরাসরি হাত ছিল ইসরায়েলের। এমনকি, প্রকাশ্যে কাতার সরকারের সমালোচনা করলেও এই অর্থের লেনদেন চালু রাখতে গোপনে দেনদরবার করেছিলেন উচ্চপদস্থ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী ‘টাইম’–এর এক বিশদ তদন্তে এই তথ্য উঠে এসেছে।

ইসরায়েলি, মার্কিন ও আরব সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চিঠিপত্র ও সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে হামাসশাসিত গাজায় কাতার থেকে সাহায্য পৌঁছানোর এই ব্যবস্থাটি তৈরি করা, চালানো এবং টিকিয়ে রাখার পেছনে সরাসরি সহযোগিতা করেছিল তৎকালীন ইসরায়েলি সরকারগুলো।

উন্মোচিত হওয়া এসব নথির মধ্যে ২০২০ সালের একটি চিঠিও রয়েছে। এটি কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে লিখেছিলেন তৎকালীন মোসাদ প্রধান ইয়োসি কোহেন। গাজায় মানবতাবাদী সহযোগিতার জন্য কাতারের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে কোহেন লেখেন, এই সাহায্য উপত্যকাটির মানবিক পরিস্থিতি উন্নত করতে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

একই বছরের আরেক চিঠিতে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা (প্রতিবেদনে যিনি আর. এল. মাওজ নামে চিহ্নিত) কাতারকে এই আর্থিক অনুদান চালু রাখার স্পষ্ট অনুরোধ জানান। বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমেই যেন কাতার তাদের মানবিক অনুদান পাঠানো অব্যাহত রাখে—সেই জোর তাগিদ দিয়ে ওই কর্মকর্তা অনুরোধ করেন, অর্থ যেন কোনো মধ্যস্থতাকারী বা অন্য দেশের মাধ্যমে না পাঠিয়ে গাজা পুনর্নির্মাণে গঠিত কাতার কমিটির চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আল-এমাদীর মাধ্যমে সরাসরি পাঠানো হয়।

টাইমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই দ্বিচারিতায় দারুণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কাতারের কর্মকর্তারা। একদিকে ইসরায়েলি নেতারা প্রকাশ্যে হামাসকে অর্থ সাহায্য দেওয়ার জন্য দোহার তীব্র নিন্দা করতেন, অন্যদিকে গোপনে গিয়ে তাদের অনুরোধ করতেন অনুদান চালিয়ে যেতে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সাময়িকীটিকে জানান, ইসরায়েলিদের এই কাণ্ড দেখে কাতার ২০১৮ সালে লিখিত প্রমাণ দাবি করে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এতে ইসরায়েলের সরাসরি সম্মতি রয়েছে।

গাজায় কাতারি অনুদানের ব্যবস্থা চালুতে সাহায্য করে ইসরায়েল

২০০৭ সালে গাজার শাসনভার হামাস হাতে নেওয়ার পর থেকেই সেখানে টাকা পাঠানো শুরু করে কাতার। তদন্তে দেখা যায়, ২০১২ সালের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার এক নতুন ব্যবস্থার অনুমোদন দেয়। এর ফলে ত্রাণ সামগ্রী ও ওষুধ পাঠানো, কোন কোন পরিবার টাকা পাওয়ার যোগ্য তা বাছাই করা, ভাতা দেওয়া এবং গাজায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর কাজে ইসরায়েলের সরাসরি ভূমিকা তৈরি হয়।

পরে ইসরায়েল, কাতার ও জাতিসংঘের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে এই সহযোগিতা জোরদার করা হয়। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর গাজায় জ্বালানি কেনার টাকা দেওয়ার জন্য তিনটি পক্ষ মিলে একটি চুক্তিতে সই করে। ২০২১ সালের আগস্টে কাতার একটি নতুন প্রকল্পে ৪০ মিলিয়ন (৪ কোটি) ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করে। উদ্দেশ্য ছিল, প্রায় ১ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে চার মাস ধরে প্রতি মাসে ১০০ ডলার করে সাহায্য দেওয়া। পরে এই চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়।

এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত কূটনীতবিদেরা জানান, কোন কোন ফিলিস্তিনি পরিবার অনুদান পাবে—সেই তালিকা ইসরায়েল নিজে যাচাই-বাছাই করত এবং পুরো টাকা বিতরণ ব্যবস্থা নজরদারি করত। জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে এসব টাকা পাঠানো হতো। নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে টাকা নেওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট পরিবারগুলোর কাছে খুদে বার্তা (এসএমএস) যেত।

তদন্তে বেরিয়ে আসা ২০১৯ সালের জুলাই মাসের একটি চিঠি থেকে জানা যায়, কাতার কীভাবে নেতানিয়াহু সরকারকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলের বাছাই করা ২০ হাজার ফিলিস্তিনির জন্য তারা ৬০ লাখ ডলার পাঠিয়েছে। এতে প্রতি পরিবার পেয়েছিল ৩০০ ডলার করে। তবে টাইম উল্লেখ করেছে, এই সহায়তা পাওয়া মানুষদের মধ্যে কতজন সরাসরি হামাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা তাদের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে হামাসের সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

অনুদানের টাকা হামাসের কাছে পৌঁছালে দায় ইসরায়েলের: কাতার

এই তদন্তের জবাবে কাতার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, গাজায় পাঠানো অনুদানের টাকা যদি কোনোভাবে হামাসের হাতে গিয়ে থাকে, তবে তার পুরো দায় ইসরায়েলের। কাতারের আন্তর্জাতিক জনসংযোগ কার্যালয়ের এক মুখপাত্র জানান, ‘গাজার সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্যই কাতারের সব অনুদান পাঠানো হয়েছিল। পুরো কাজটি পরিচালিত হয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি দাবি করে যে এই অর্থ হামাসের কাছে পৌঁছেছে, তবে তার দায় ইসরায়েলের ওপরই বর্তায়। কারণ, পুরো তহবিল বিতরণ ব্যবস্থা তারাই তৈরি করেছিল এবং তারাই তা তদারকি করত।’

তদন্তে আসা সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে আরও দেখা যায়, ২০২৩ সালে কাতার এই ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল গাজার সাধারণ মানুষ যেন হামাস বা ইসরায়েল সরকারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে না থাকে। কিন্তু ইসরায়েল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূত্রের খবর, নেতানিয়াহু সরকার আগের সেই পুরোনো ব্যবস্থাই বহাল রাখতে চেয়েছিল।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের দুই সপ্তাহ আগেও অনুদান বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলেন মোসাদ প্রধান

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, তৎকালীন মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া দোহায় গিয়ে কাতারকে গাজায় অনুদান দেওয়া চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে এই তথ্য আগেই এসেছিল। তবে টাইম সাময়িকী নতুন তথ্যে জানিয়েছে, কাতারি কর্মকর্তারা তাতে রাজি হলেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, এটাই হবে তাদের শেষ অনুদান।

বার্নিয়া সেসময় কাতারকে আরও দুই মাসের অনুদান বাড়ানোর অনুরোধ করেন। এই আলাপের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলিদের ধারণা ছিল অনুদানের টাকা পাওয়া বন্ধ হলে হামাস বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই এই টাকা ছিল হামাসের ওপর ইসরায়েলের চাপ সৃষ্টির একটি হাতিয়ার। নেতানিয়াহু সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেতও এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। কিন্তু তিনিও ক্ষমতায় এসে কাতার থেকে ত্রাণ আসা বন্ধ করেননি। তবে সুটকেসে করে নগদ টাকা গাজায় নিয়ে যাওয়ার নিয়মটি বেনেট বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

জো বাইডেন প্রশাসনের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ওই সময় কাতার এই অনুদান দেওয়ার ইতি টানতে চেয়েছিল। কিন্তু এক ইসরায়েলি প্রতিনিধি মার্কিন দূতকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, ‘আমরা এই ব্যবস্থা যেমন আছে, ঠিক তেমনই চালিয়ে যেতে চাই।’

হামাসের শাসন টিকিয়ে রাখার দাবি প্রত্যাখ্যান নেতানিয়াহুর

নেতানিয়াহুর সমালোচকদের মূল দাবি—ইসরায়েলের এই নীতির কারণেই গাজায় হামাসের শাসন টিকে ছিল এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) ও হামাসের মধ্যবর্তী রাজনৈতিক বিরোধ বজায় রাখা সহজ হয়েছিল। তবে নেতানিয়াহু সব সময়ই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। ২০২৪ সালে টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, গাজার সাধারণ বেসামরিক প্রশাসন যেন ভেঙে না পড়ে এবং সেখানে পয়োনিষ্কাশন, সুপেয় পানি ও শিক্ষা ব্যবস্থার মতো জরুরি সেবাগুলো যেন সচল থাকে, সে কারণেই এই অর্থের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক এই তদন্তের বিষয়ে নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে নতুন করে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। নথিপত্রগুলোতে ৭ অক্টোবরের হামাসে কাতার থেকে পাওয়া টাকা সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এতে স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষকে আর্থিক সহায়তা দিলে গাজায় স্থিতিশীলতা থাকবে এবং হামাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে—এমন একটি নীতি নিয়েই এগোচ্ছিল ইসরায়েল।

ইসরায়েলের এক সাবেক শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা টাইমকে বলেন, ‘ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হলেও, একাধিক প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে চলা এই নীতিটি আদতে আমাদের এক বিরাট ব্যর্থতা।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তবে এর কেন্দ্রে অবশ্যই নেতানিয়াহু ছিলেন। তিনিই এই প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন, ত্বরান্বিত করেছেন এবং তাঁর সরকারই পুরো বিষয়টি তদারকি করার জন্য দায়ী ছিল।’

উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ‘প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের’ আবির্ভাব, ঘোষণা শিগগির

ইরানে ‘কাজ শেষ করার’ হুমকি ট্রাম্পের, মার্কিন সমর্থন ছাড়াই হামলায় প্রস্তুত নেতানিয়াহু

সৌদির পক্ষে ইয়েমেন যুদ্ধে নামছে আরব আমিরাতও

পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর ইসরায়েলি সেটলারদের হামলা–মারধর

হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদিকে সহায়তা দিতে চান মিসরের সিসি, পার্লামেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষা

সৌদিতে কিশোর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ‘অপরাধে’ তরুণের মৃত্যুদণ্ড

এবার এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ফিলিস্তিনি জলপাইচাষিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা

মার্কিন অবরোধের মধ্যেও এলপিজি ও জেট জ্বালানি রপ্তানি করছে ইরান

সিরিয়ায় উপকূলীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই আসাদপন্থীর মৃত্যুদণ্ড