ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় প্রাণ বাঁচাতে লোহিতসাগর পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশ জিবুতিতে পালিয়ে যাচ্ছে হাজারো ইয়েমেনি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির লোহিতসাগর উপকূলে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর ধুবাবের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী ইব্রাহিম ইসা পরিবার নিয়ে এখন জিবুতির উত্তরাঞ্চলের মার্কাজি শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধের সম্মুখসারিতে থাকা নিজ শহর থেকে ছোট নৌকায় তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পাড়ি দেন।
ইব্রাহিম জানান, যুদ্ধবিমান উড়তে শুরু করলেই তাঁর সন্তানেরা আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদত। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের যখন এভাবে ভয় পেতে দেখি, তখন কীভাবে সেখানে বসে থাকি? তাদের বাঁচাতেই আমরা পালিয়েছি।’
পেশায় জেলে ইব্রাহিমের নিজের নৌকা থাকায় পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। সঙ্গে কয়েকটি ছাগলও নিয়ে এসেছেন তিনি। তবে অনেক পরিবার কোনো সম্পদ সঙ্গে নিতে পারেনি; পরনের পোশাকটুকু নিয়েই তাদের শরণার্থীশিবিরে পৌঁছাতে হয়েছে।
গত কয়েক দিনে তিন হাজারের বেশি ইয়েমেনি শরণার্থী জিবুতিতে পৌঁছেছে। অনেকেই পুরো পরিবার নিয়ে এসেছে। নৌপথে জিবুতিতে পৌঁছানোর পর তাদের কেউ ট্রাকে, কেউ হেঁটে মার্কাজি শিবিরে যায়। শিবিরটি জিবুতি সরকার ও জাতিসংঘ যৌথভাবে পরিচালনা করছে।
সম্প্রতি হুতিরা ইয়েমেনের লোহিতসাগর উপকূল ধরে বাব আল-মান্দেবের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এই সরু প্রণালি লোহিতসাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে হুতিদের অগ্রযাত্রার জবাবে সৌদি আরব উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। পাল্টা হুতিরাও দক্ষিণ-পশ্চিম সৌদির বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
জিবুতিতে আশ্রয় নেওয়া ইয়েমেনিরা বলছেন, তাঁরা কোন পক্ষ যুদ্ধ করছে, তা নিয়ে ভাবছেন না। তাঁদের কাছে মূল বিষয় হলো চারপাশে বোমা ও বিমান হামলার আতঙ্ক থেকে সন্তানদের নিরাপদ রাখা।
মার্কাজি শিবিরে থাকা ১০০ বছর বয়সী কাসিম আব্রাহাম আবসি বলেন, ‘বিমানের শব্দই আমাদের পালাতে বাধ্য করেছে। আমরা জানি না কোন পক্ষের বিমান। চারদিকে বোমা পড়ছে।’
এডেনের ৬৩ বছর বয়সী সাবেক পর্যটন গাইড মোহাম্মদ আবদুলারিম ২০১৫ সাল থেকে এই শিবিরে আছেন। দীর্ঘদিন পরও নিজের দেশের মানুষের দুর্ভোগ দেখে তিনি কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে চলা যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত ও লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
শরণার্থী কাসিম ও তাঁর স্ত্রী আয়েশা আবদুলকাদির মোহাম্মদ এখন দেশে ফিরতে চান না, যতক্ষণ না শান্তি ফিরে আসে। আয়েশা বলেন, ‘আমাদের শুধু শান্তি দরকার। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য আগে নিরাপত্তা, তারপর খাবার, পানি ও শিক্ষা।’
যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এই মানুষগুলোর কাছে বাব আল-মান্দেবের কৌশলগত গুরুত্ব বা তেল সরবরাহের হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একটি সাধারণ আকাঙ্ক্ষা আর তা হলো—নিজের সন্তানদের নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখা।