গাজা উপত্যকায় কার্যত সরকারের দায়িত্ব পালন করা নিজেদের প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে হামাস। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য কমাতে আগামী দুই দিনের মধ্যে মিসরের রাজধানী কায়রোতে হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। হামাসের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ইসরায়েল আগামী কয়েক মাসের মধেই গাজায় ফের যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে।
লন্ডনভিত্তিক আরবি দৈনিক আশারক আল-আওসাত গতকাল রোববার হামাসের দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামাসের নেতৃত্ব শিগগিরই গাজার দেখভাল করা ‘কমিটি ফর মনিটরিং গভর্নমেন্ট অ্যাকটিভিটি’ বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিতে পারে। এই কমিটিই এত দিন গাজা উপত্যকায় কার্যত হামাস সরকারের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে আসছিল।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, কমিটি বিলুপ্তির উদ্দেশ্য হলো গাজা শাসনের জন্য জাতীয় কমিটি বা টেকনোক্র্যাটস কমিটিকে গাজায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা তাদের কাছে হস্তান্তর করা। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন আলি শা’আত।
হামাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা আজ সোমবারের মধ্যেই প্রকাশ করা হতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র বলেছে, ঘোষণার সময় খুবই নিকটে হলেও নির্দিষ্ট কোনো তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে, ইসরায়েল মনে করছে, আগামী দুই মাসের মধ্যেই গাজায় আবারও যুদ্ধ শুরু হতে পারে। এমনকি অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আগেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে দখলদারদের আগ্রাসন পুনরায় শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল–১২-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত শনিবার সম্প্রচারিত ওই প্রতিবেদনে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদ আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে, নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতি জানিয়ে হামাস চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমন সিদ্ধান্ত এলে বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা গাজার বিভিন্ন এলাকায় আবারও সামরিক অভিযান চালানোর পথ খুলে যেতে পারে। এর ফলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হবে। চ্যানেলটি আরও জানিয়েছে, একটি রাজনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী—বোর্ডের মহাপরিচালক নিকোলাই ম্লাদেনভ দুই মাস আগেই হামাসকে চুক্তি লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত ঘোষণা করার কথা বিবেচনা করেছিলেন। তবে মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে তিনি সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করেন।
সূত্রটি বলেছে, ‘আগামী তিন মাসের মধ্যে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না হলে ম্লাদেনভ ঘোষণা করবেন যে হামাস চুক্তি ভঙ্গ করেছে।’
অপরদিকে, হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সূত্রগুলো জানিয়েছে, গাজায় কার্যকর থাকা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে অচলাবস্থা কাটাতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কায়রোতে নতুন দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অক্টোবর ঘোষিত বহুধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েল লঙ্ঘন করেছে। এতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং হামাসের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে মিসর, কাতার ও তুরস্কের নেতৃত্বে মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তিটিকে টিকিয়ে রাখা এবং পরবর্তী ধাপগুলোর বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন, যাতে গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।
এ ছাড়া সূত্রগুলোর দাবি, বোর্ড অব পিসের গাজার প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ আলোচনায় অংশ নিতে মিসরে পৌঁছেছেন। সেখানে তিনি বোর্ড অব পিসের আওতায় কাজ করা মার্কিন কর্মকর্তাদের এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।
তবে ম্লাদেনভের পক্ষ থেকে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এর আগে জানিয়েছিল, হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী সর্বশেষ সংশোধিত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং চুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হয়, তার ওপরই তাঁর অংশগ্রহণ নির্ভর করবে।