ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা পেশমার্গা বাহিনীকে একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) এই ঐতিহাসিক একীভূতকরণের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে কয়েক দশক ধরে পৃথক কমান্ড কাঠামো, রসদব্যবস্থা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মধ্যে থাকা কুর্দি বাহিনী এখন কুর্দিস্তান সরকারের পেশমার্গা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করবে।
‘পেশমার্গা’ শব্দের অর্থ ‘যারা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়’। উত্তর ইরাকের কুর্দি যোদ্ধাদের এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে কুর্দিদের জাতীয় সশস্ত্র শক্তি হিসেবে পরিচিত। বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সংঘাতেও তারা অংশ নিয়েছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ এবং সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর পেশমার্গাকে ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে কুর্দিস্তানের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) এবং প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে)—দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ পেশমার্গা ইউনিটের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল। এর ফলে বাহিনীটির কমান্ড ও রাজনৈতিক আনুগত্য বিভক্ত ছিল। একীভূত করার আগের কয়েকটি উদ্যোগও বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
সোমবার মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল জানায়, ইরবিলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কুর্দিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও পেশমার্গার কমান্ডার-ইন-চিফ নেচিরভান বারজানি এবং প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি ছাড়াও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের উপদেষ্টা এবং ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নেচিরভান বারজানি বলেন, এখন পেশমার্গা মন্ত্রণালয়ের কাঠামোর বাইরে কোনো বাহিনী থাকবে না। পেশমার্গাকে দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি পেশাদার জাতীয় বাহিনীতে পরিণত করাই এই সংস্কারের লক্ষ্য।
মাসরুর বারজানি দিনটিকে কুর্দিস্তান ও পেশমার্গার জন্য ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই একীভূতকরণ দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
পেশমার্গার একীভূতকরণ কেবল কুর্দিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় এক দশক ধরে ওয়াশিংটন পেশমার্গাকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও বিমান সহায়তা দিয়ে আসছে। বাহিনীর বিভক্ত কমান্ড কাঠামো আইএসবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা কমিয়েছে এবং জবাবদিহি ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।
কুর্দি নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। মাসরুর বারজানি বলেন, পরবর্তী লক্ষ্য হবে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
তিনি বলেন, একীভূত পেশমার্গা ইরাকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কুর্দিস্তান অঞ্চল ও পুরো ইরাকের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখবে।
পেশমার্গা একীভূত হওয়ার সময়ই ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। ফলে কুর্দি বাহিনীকে একক কমান্ডে আনার উদ্যোগকে ইরাকের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।