হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ খুলতে ইরানের ৭ দিনের রোডম্যাপ, কী আছে এতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: এএফপি

প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান এই জলপথ দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থার মধ্যে থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, নৌবাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৭ দিনের একটি রোডম্যাপ দিয়েছে ইরান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। যদিও উভয় পক্ষই এই পরোক্ষ যোগাযোগকে ইতিবাচক বলছে, তবুও এখনো কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেই পরদিন থেকে সাত দিনের সময়সূচি কার্যকর করা সম্ভব হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ খুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনা যতটা এগোচ্ছে, পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের অবস্থান ততটাই ভিন্ন রয়ে গেছে।

কী প্রস্তাব দিয়েছে ইরান

নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন রোডম্যাপ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে সপ্তম দিনের শেষে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং শান্তি আলোচনা আবার শুরু হবে।’

যদিও আরাঘচি প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেননি, তবে জানান এটি মূলত গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ।

চলতি বছরের জুনের সেই সমঝোতায় হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ দিনের জন্য টোলমুক্ত রাখার কথা ছিল, যাতে ওই সময়ের মধ্যে শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু ৬০ দিনের পর কী হবে, সে বিষয়ে সমঝোতায় স্পষ্ট কিছু উল্লেখ ছিল না।

নতুন প্রস্তাবে ইরান সেই দীর্ঘ সময়সীমাকে কমিয়ে মাত্র সাত দিনে নিয়ে এসেছে এবং আলোচনার ক্রমও বদলে দিয়েছে।

সাত দিনের সময়সূচিতে কী থাকবে

আল জাজিরার প্রতিবেদনে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তা কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম ধাপে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে। এর মধ্যে শুধু ইরান নয়, লেবাননেও চলমান সংঘর্ষ বন্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে, তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদের একটি অংশ মুক্ত করবে।

এরপর সপ্তম দিনের শেষে হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

সবশেষে হরমুজ চালু হওয়ার পর শুরু হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত শান্তি আলোচনা।

অর্থাৎ, ইরানের প্রস্তাবে পারমাণবিক ইস্যু প্রথম নয়; বরং হরমুজ পুনরায় চালু করাকেই আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে।

কেন জুনের সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ

১৭ জুনের সমঝোতা স্মারক বর্তমান আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই সমঝোতায় সব ধরনের সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার পাশাপাশি ৬০ দিনের আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ছাড় এবং হরমুজে সামুদ্রিক চলাচল স্বাভাবিক করার ব্যবস্থাও ছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে প্রণালির নৌপথ নিয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি হলে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক আরবান কনিংহ্যামের মতে, ইরানের বর্তমান পরিকল্পনা মূলত সেই মডেলই অনুসরণ করছে। পার্থক্য হলো, এবার সাত দিনের মধ্যে হরমুজ খুলে দিয়ে পরে পারমাণবিক আলোচনায় যেতে চায় তেহরান।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সব বিষয়কে একসঙ্গে একটি প্যাকেজ হিসেবে আলোচনা করতে চায়। এ কারণেই দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে মূল অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ কেন ইরানের ‘রেড লাইন’

হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি সংকীর্ণ জলপথ, যার মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের পর ইরানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এই প্রণালি।

কনিংহ্যাম আল জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পাবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তাই হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণই তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এই কারণেই তেহরান সহজে হরমুজ ইস্যুতে আপস করবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির কৌশল

তবে ইরানের প্রস্তাবটি শুধু কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক চাপ তৈরিরও একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের অধিবেশনের মঞ্চে প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনা তুলে ধরে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে জ্বালানি বাজারের বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে।

বর্তমানে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং হরমুজে অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় তেলের দাম কমানো রিপাবলিকান প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।

কনিংহ্যাম বলেন, ইরান মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। তারা দেখাতে চায়, হরমুজ খুলে গেলে জ্বালানির দাম কমতে পারে, আর সেটি নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও লাভজনক হতে পারে। তবে তাঁর ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই চাপ সহ্য করতেও প্রস্তুত।

পারমাণবিক ইস্যুতেই বড় অচলাবস্থা

নিউইয়র্কে কাতারের মধ্যস্থতায় আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

আরাঘচি বৈঠককে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করলেও, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এটিকে কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি বলা ঠিক হবে না।

মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক বুরজু ওজচেলিকের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারবে—এই হিসাবেই আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।

বুরজু ওজচেলিক আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে ইরানকে চাপে রেখেছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়।

সমঝোতার সম্ভাবনা কতটা

ইরানের ৭ দিনের পরিকল্পনা হরমুজ সংকট নিরসনের একটি নতুন রূপরেখা সামনে আনলেও, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে দুই দেশের মৌলিক মতপার্থক্য।

তেহরান চায় আগে নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজের সংকটের সমাধান হোক; এরপর শুরু হোক বিস্তৃত শান্তি আলোচনা। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান—পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছু একই আলোচনার অংশ হতে হবে।

ফলে সাত দিনের এই পরিকল্পনা নতুন আশার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে হরমুজ পুনরায় খুলবে কি না, তা এখনো নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।