ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। সর্বশেষ, গত শনিবার বিক্ষোভ দমনে অভিযানের সময় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, ইলাম প্রদেশের মালেকশাহি কাউন্টিতে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালালে আরও ৩০ জন আহত হন। কুর্দি অধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, গত সপ্তাহে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
অধিকারকর্মীদের নেটওয়ার্ক এইচআরএএনএ নিহতের সংখ্যা ১৬ বলে জানিয়েছে এবং বলেছে, ৫৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করলেও বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এখনো তা রাজধানী তেহরানে পৌঁছায়নি।
মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি হলে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করবে। তিনি বলেন, ‘ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে ও সহিংসভাবে হত্যা করে, যা তাদের অভ্যাস, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে। আমরা প্রস্তুত ও সম্পূর্ণভাবে সজ্জিত।’
সরকারপন্থী কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল হিসেবে কাজ করার অভিযোগ তুলেছে। এমন বক্তব্যকে কেউ কেউ আরও কঠোর দমন-পীড়নের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিক্ষোভে ভূমিকা রেখেছে এবং সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে ‘পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে এবং আমেরিকার স্বার্থ ধ্বংস হবে।’
ইরানে এই বিক্ষোভ শুরু হয় গত সপ্তাহের রোববার, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ধর্মঘটের মাধ্যমে। দ্রুতই তা অন্তত ৩০টি শহরে ছড়িয়ে পড়া দেশব্যাপী রাজনৈতিক বিক্ষোভে রূপ নেয়, যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় অস্থিরতার ঢেউ। মাসের পর মাস ধরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান কমছে, ফলে মূল্যস্ফীতি ও পণ্যমূল্য বেড়েছে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ খোলা বাজারে এক ডলার লেনদেন হচ্ছিল প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে, যেখানে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের সময় তা ছিল প্রায় ৫৫ হাজার রিয়াল।
ডলারের বিনিময় হার ইরানের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, আর রিয়ালের পতন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাপক দুর্নীতি এই সংকটের প্রধান কারণ।
জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার পর রিয়ালের পতন আরও দ্রুত হয়। ১২ দিনের সংঘাত শেষে খোলা বাজারে এক ডলার লেনদেন হচ্ছিল প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে।