উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসরায়েলি বাধায় গাজা ছাড়তে না পারায় ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহ সীমান্ত পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগী এখনো বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম আল আরব আল–জাদিদ বা নিউ আরব জানিয়েছে—গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৭ জন রোগী চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় থেকে মারা গেছেন। এ ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলটির প্রায় ২১ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানান্তরের জন্য অপেক্ষায় থাকা রোগীদের মধ্যে ৫ হাজার ৬০০ জন শিশু এবং ২ হাজার ৮০০ জন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৪ জনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং অবিলম্বে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আরও ২ হাজার জন রোগীকে অত্যন্ত জরুরি বা ইমার্জেন্সি ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, যার মাধ্যমে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও তার প্রায় এক বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু ইসরায়েলের অব্যাহত অবরোধ এবং গাজার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ মানবিক পরিণতিই ফুটে উঠেছে এই পরিসংখ্যানে।
২০২৪ সালের মে মাসে দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর মিসর সীমান্তসংযুক্ত প্রধান এই প্রবেশদ্বারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে গাজার ভেতরে যেসব বিশেষায়িত চিকিৎসা সম্ভব নয়, সেগুলোর জন্য রোগীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়ে। বিকল্প উপায়ে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কিছু রোগীকে বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলেও বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা মানুষের তুলনায় এই কার্যক্রমের সক্ষমতা একেবারেই অপ্রতুল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে মিলে রোগী স্থানান্তরের কাজটি পরিচালনা করে। গাজা ছাড়ার আগে রোগীদের জন্য রেফারেন্স বা বিশেষ সুপারিশ, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং গ্রহণকারী হাসপাতালের সম্মতিপত্র জোগাড় করতে হয়। ইসরায়েলি অধিকার সংস্থা ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েলের এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির প্রথম এক বছরে গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামান্যই উন্নতি হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার কোনো হাসপাতালেই পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হতে পারেনি এবং পুরো অঞ্চলে বর্তমানে সচল কোনো এমআরআই স্ক্যানার নেই।
২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর থেকে আংশিক চালু থাকা হাসপাতালের সংখ্যা ১৪টি থেকে বেড়ে ২০ টিতে দাঁড়িয়েছে সত্য, তবে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সক্ষমতা ১০৩টি বেড থেকে বেড়ে মাত্র ১০৪ টিতে উন্নীত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ডায়ালাইসিস সেবা আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ডায়ালাইসিস সুবিধা দেওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের হার ১৭ শতাংশ থেকে কমে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাটি গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আগের একটি হিসাব উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত সময়ে বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় থেকে অন্তত ১ হাজার ৫৭০ জন রোগী মারা গেছেন, যাদের মধ্যে ২৬৪ জন শিশু এবং ৫০৫ জন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী ছিলেন। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নতুন ২ হাজার ০২৭ জনের মৃত্যুর হিসাবটি ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহ সীমান্ত বন্ধ হওয়ার পর থেকে ধরা হয়েছে, যা আগের হিসাবের সাথে যোগ করা যাবে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আইনি লড়াই সত্ত্বেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজার রোগীদের অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমের হাসপাতালগুলোতে স্থানান্তরের অনুমতি দিচ্ছে না। গত জুলাই মাসে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টও এই নীতিতে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে রোগী স্থানান্তর সম্পূর্ণভাবে তৃতীয় কোনো দেশের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব বিধিনিষেধের কারণে গাজার রোগীরা এমন ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে পারছেন না, যেখানে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব ছিল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে, দীর্ঘসূত্রতার কারণে আরও হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে, কারণ গাজার ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলোর পক্ষে বিশেষায়িত এবং জরুরি সেবা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।