পাকিস্তান গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কাছে চার কার্গো বিমানে করে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। ইয়েমেনে হুতিদের ব্যাপক সামরিক অভিযান ঠেকাতে সৌদি আরব যখন বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন পাকিস্তানের এই অস্ত্র সহায়তার খবর সামনে এল।
গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে পাকিস্তানের এসব অস্ত্র পাঠানোর ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইয়েমেনের যুদ্ধে ইসলামাবাদ সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে এক পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পাকিস্তান এডেনে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা পাঠিয়েছে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছেন এবং ইয়েমেনি সেনাদের সহায়তা করছেন।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে পশ্চিমা ও আরব বিশ্বের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হুতিদের বড় ধরনের সামরিক অভিযান মোকাবিলায় সৌদি আরব উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। হুতিদের এই অভিযানের ফলে ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাইজ শহরের আশপাশে তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার হুতিরা তাইজের আশপাশে ইয়েমেন সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোকে এডেনের সঙ্গে যুক্ত করা একটি সেতু ধ্বংস করেছে। হুতিরা যদি ইয়েমেন সরকারের কাছ থেকে তাইজের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তাহলে তারা এডেন বন্দরনগরীকে উত্তরের সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে। একই সঙ্গে ইয়েমেন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ লাইনও ব্যাহত হবে।
সৌদি আরবও হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। হুতিরা বৃহস্পতিবার দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরব তাদের বিরুদ্ধে ৯৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনী রাজধানী সানায় একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা’ চালিয়েছে এবং সানা শহর ও প্রদেশে ১১টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। সৌদি আরব আরও জানিয়েছে, তাইজে একটি ‘সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থাপনা কমান্ডের’ ওপর ২৭টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
হুতিরাও সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রিয়াদ বিমানবন্দরও রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে পবিত্র নগরী মদিনার একটি বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ আনে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, একটি ড্রোন তাইবা বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্রে আঘাত হানে। এই কেন্দ্র থেকে মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে হুতিরা ওই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে কয়েক দশকের পুরোনো সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে পাকিস্তান ও তুরস্ক ঠিক কতটা সহায়তা করবে, তা এখন ‘মক্কা চুক্তি’র জন্য একটি প্রাথমিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগস্টে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।
গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূল দিয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে অবরোধ আরোপ করলেও পাকিস্তান ও তুরস্ক তখন সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি এবং অনেকটা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশকেই রিয়াদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ ইরান হুতিদের অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক উপদেষ্টা দিয়ে সহায়তা করে আসছে।
সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার এখনো যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে প্রকাশ্যে কোনো ভূমিকা নেয়নি। যদিও পাকিস্তানের মতো যুক্তরাষ্ট্রও সেখানে সামরিক উপদেষ্টা ও অস্ত্রব্যবস্থা পাঠিয়েছে।
হুতিদের মোকাবিলায় সহায়তার জন্য সৌদি আরব এখন মিত্র খুঁজছে। এরই অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের প্রকাশ্য উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব। উপসাগরীয় এই প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে ইয়েমেন ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরোধ হয়েছিল। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন করায় দুই দেশের মধ্যে এই বিরোধ তৈরি হয়েছিল। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মানসুর বিন জায়েদকে আতিথ্য দেন।