যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের তেল স্থাপনা, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্থাপনায় হামলা চালাবে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই এ কথা বলেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটাতে আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া কট্টরপন্থী নেতা মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মদি বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নীতিগতভাবে ইরানে হামলার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে তাঁরা সফল পরিণতি নিশ্চিত করতে পারবেন না।
মোহাম্মদি আরও বলেন, ‘আমরা পরবর্তী সংঘাতকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছি। দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ মানেই অস্তিত্বের ওপর হুমকি। আমাদের কৌশল হলো ‘কোনো লাল রেখা নয়’।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সংঘাতের সময় ও ভৌগোলিক পরিসরের প্রচলিত সীমা ভেঙে দেব। শত্রুপক্ষ যতটা সময় ও যতটা বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় যুদ্ধ চলবে বলে ধারণা করছে, তার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এবং আরও বিস্তৃত অঞ্চলে যুদ্ধ চলবে।’
চীন বা রাশিয়ার কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনাসহ এ ধরনের অভিযান চালানোর ইরানের সক্ষমতা, যুদ্ধ আবার শুরু করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেজাই ঘোষণা করেছেন, ‘যুদ্ধ শুরু হলে সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। সংঘাত আবার শুরু হলে আমাদের পরিকল্পনা হবে আরও বিস্তৃত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমন কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না, যেখানে ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখাগুলোতে হামলা চালানো হবে, অথচ সেই হামলা সম্ভব করে তোলা অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে অক্ষত ও হামলার ঊর্ধ্বে বলে বিবেচনা করা হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে যৌথ হামলা চালানোর জন্য মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা লক্ষ্যবস্তুর একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছেন।
বুধবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে একই সময়ে হামলা চালানো হয়েছে। বলা হয়েছে, জাহাজগুলো এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করছিল। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, প্রণালিতে মাইনে আঘাত লাগার কারণে আরও তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এতগুলো জাহাজে হামলা বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই করা যায়নি।
এদিকে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আসন্ন যৌথ হামলা নিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৩ দশমিক ৪ ডলারে উঠেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি।
গত চার মাসে ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সাতবার সরে এসেছেন ট্রাম্প। তবে কূটনৈতিক আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ায় মার্কিন সরকারি কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের বিষয়ে তথ্য দিতে শুরু করেছেন। ওই অভিযানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, তেল স্থাপনা ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হুমকির সঙ্গে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক মহড়াও দীর্ঘায়িত হয়েছে। এসব মহড়ার মধ্যে ইরাকের আকাশসীমার ওপর দিয়ে পরিচালিত অনুশীলনও রয়েছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি দিয়ে উড়ে গেছে। এদিকে, মধ্য ইরানের আরাক শহরের একটি বড় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশটির ভেতরে নাশকতামূলক অভিযান চলতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক আইনজীবী রেজা নাসরি বলেছেন, ‘যুদ্ধের তৃতীয় দফা শুরু হলে তা শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড, সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার স্থাপনা, তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলোতে আগুন জ্বলবে। কোটি কোটি মানুষ পানি ও বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়বে। আরব দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ইউরোপের দিকে ছুটবে।’
নাসরি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, তেলের দাম হু হু করে বাড়বে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে চলে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের প্রস্তুতি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত ইসরায়েলের অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে পারবে না। আর ট্রাম্প এমন এক সংকটে আটকে পড়বেন, যা তাঁর প্রেসিডেন্সির বাকি সময়টুকু গ্রাস করবে এবং পরবর্তী উত্তরসূরিদের জন্য ধ্বংসস্তূপ রেখে যাবে।’
আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, ইরান তার বিভিন্ন সামরিক ও অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নতুন করে ব্যাপক আকারের যুদ্ধ শুরু হলে, বিশেষ করে ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা এবং বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে, ইরানের পাল্টা হামলা শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুও এর আওতায় আসবে। এদিকে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা খুঁজতে চলতি সপ্তাহে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা আবারও কয়েকটি পরিচিত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রস্তাবগুলো নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইরানকে তার জব্দ করা সম্পদ থেকে কয়েক শ কোটি ডলার ফেরত দেওয়া। এর বিনিময়ে দেশটি হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ তুলে নেবে, জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেবে এবং নিজেদের মজুত করা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠাবে।
ইরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়া এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এ জন্য আগে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। এসব পূর্বশর্তের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।