ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৪০ জন হুতি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইয়েমেনের সরকার। ইয়েমেনের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বিভিন্ন রণাঙ্গনে হুতিদের অবস্থান, সামরিক শক্তিবৃদ্ধির জন্য পাঠানো বাহিনী, কমান্ড সেন্টার এবং সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে তারা ৪৭৪টি অভিযান চালিয়েছে। সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এসব অভিযানে হতাহতদের অধিকাংশই তাইজে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, ইয়েমেন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি বলেন, এসব অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তাইজ এখন অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ হতাহতের দাবি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এই প্রদেশে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়ে উঠছে। গত কয়েক সপ্তাহে তাইজ প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে বানি বাকারি, মাকবানাহ, আল-আকুরদ এবং তাইজ শহরের উত্তর ও পূর্ব দিকের প্রবেশপথগুলোতে বারবার সংঘর্ষের খবর জানিয়েছে সরকারপন্থী বাহিনী।
গতকাল শনিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী আল-হুবান ক্রসিং বন্ধ করে দেয়। এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথটি হুতি-নিয়ন্ত্রিত আল-হুবান এলাকার সঙ্গে সরকার-নিয়ন্ত্রিত তাইজ শহরকে যুক্ত করেছে। ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নিরাপত্তার কারণে ক্রসিংটি বন্ধ করা হয়েছে। তাদের দাবি, হুতিরা ওই পথে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে, সড়কের আশপাশে হামলা চালিয়েছে এবং সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এক সামরিক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘মানবিক কারণে’ ২০২৪ সালে বেসামরিক মানুষের চলাচলের জন্য আবার খুলে দেওয়ার আগে ক্রসিংটি টানা নয় বছর বন্ধ ছিল। ক্রসিংটি আবার বন্ধ করে দেওয়ায় দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সরকারি বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাইজের আশপাশের কৌশলগত সড়ক ও উঁচু ভূখণ্ডের দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী জানায়, তাইজে হুতি বাহিনীকে লক্ষ্য করে তারা ৭১টি অভিযান চালিয়েছে।
সর্বশেষ এই উত্তেজনা এমন এক সময় দেখা দিয়েছে, যখন জুলাই মাসে আপেক্ষিক শান্তির একটি সময়ের অবসান ঘটে। ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ওই শান্ত পরিস্থিতির সূচনা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের কয়েকটি এলাকায়, বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরের আশপাশে, হুতিরা অগ্রসর হয়। এরপর সরকারপন্থী বাহিনী জানায়, তারা কয়েকটি রণাঙ্গনে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবস্থান পুনর্দখল করেছে।
এই লড়াইয়ের ফলে নতুন করে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের শিবির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সেপ্টেম্বরে অন্তত ১ লাখ ৯৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সংস্থাটি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দেওয়া প্রদেশগুলোর মধ্যে তাইজের অবস্থান সবার ওপরে। প্রদেশটির ১৫টি জেলায় ১৩ হাজার ৯২৫টি পরিবারের মোট ৯৭ হাজার ৫২৯ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ ছড়িয়ে রয়েছেন।
এর আগে, ২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে এবং উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলে এই সংঘাতের সূচনা হয়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি জোট দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ইয়েমেনের উচ্চভূমি ও লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে তাইজ দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।