এপির প্রতিবেদন
ইরানজুড়ে চলা বিক্ষোভ আজ রোববার তৃতীয় সপ্তাহে পা রেখেছে। রাজধানী তেহরান এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদসহ বিভিন্ন প্রান্তের রাজপথ এখন বিক্ষোভকারীদের দখলে। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, এই দুই সপ্তাহের সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ১১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এবং টেলিফোন লাইন বন্ধ থাকায় বিদেশ থেকে পরিস্থিতির সঠিক খবর পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি নিহতের সংখ্যা ১১৬ উল্লেখ করে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা বাড়ছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৬০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাকের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, আমেরিকা যদি ইসলামিক রিপাবলিকে হামলা চালায়—যেমনটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন—তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ইসরায়েল হবে তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু।’ পার্লামেন্টে গালিবাফ যখন এই হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন এমপিরা ডায়াসের সামনে জড়ো হয়ে ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
বিদেশে অবস্থানরত ইরানিরা আশঙ্কা করছেন, তথ্যের এই ব্ল্যাকআউট বা সংবাদহীনতার সুযোগে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন শুরু করতে পারে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের রক্ষায় তিনি ইরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত।
বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, সম্ভবত এমনটা আগে কখনো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের জন্য প্রস্তুত!!!’ নিউইয়র্ক টাইমস এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শনিবার রাতে ট্রাম্পকে ইরানে হামলার সামরিক পরিকল্পনাগুলো দেখানো হয়েছে, যদিও তিনি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
স্টেট ডিপার্টমেন্ট আলাদাভাবে সতর্ক করে বলেছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে খেলা করবেন না। তিনি যখন কিছু করবেন বলেন, তখন সেটি করেই ছাড়েন।’ ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পার্লামেন্টের অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সেখানে গালিবাফ বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের, বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবী বাসিজ বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের জনগণের জানা উচিত, আমরা আটককৃতদের কঠোরতম শাস্তি দেব।’
তিনি সরাসরি ইসরায়েল এবং মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘ইরানে হামলা হলে অধিকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং এই অঞ্চলে থাকা সব মার্কিন সামরিক কেন্দ্র, ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের লক্ষ্যবস্তু হবে। আমরা শুধু হামলার পর পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য বসে থাকব না, বিপদের কোনো সংকেত পেলেই ব্যবস্থা নেব।’
গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তারা কতটা সফলভাবে পাল্টা হামলা চালাতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যুদ্ধের যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ধারণা করা হচ্ছে, স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাঠানো ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে উত্তরের পুনাক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছেন। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী রাস্তা বন্ধ করে দিলেও মানুষ মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে এবং পটকা ফাটিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
মাশহাদে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। রাস্তার মাঝে ময়লার ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে পথ অবরোধ করা হয়েছে। শিয়া ইসলামের পবিত্র স্থান ইমাম রেজা মাজার এই শহরে হওয়ায় এখানকার বিক্ষোভ সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। ইতিমধ্যে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা বিক্ষোভে অংশ নেবে তাদের ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক কল বন্ধ থাকায় দেশ এখন বাইরের জগৎ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। কাতারভিত্তিক আল–জাজিরা বাদে অন্য কোনো বড় বিদেশি সংবাদমাধ্যম সেখান থেকে কাজ করতে পারছে না। সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভি আজ রোববারও জনগণকে রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
মূলত মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গত ২৮ ডিসেম্বর এই বিক্ষোভ শুরু হলেও এখন তা সরাসরি ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নিয়েছে।