হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের ‘গোপন অস্ত্র’ চীনা সহায়তা, ৬ মাসে পৌঁছেছে ১৩০০ চালান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ভূগর্ভস্থ টানেলে ইরানে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি একটি ড্রোন। ছবি: এএফপি

মাস কয়েক আগে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যখন অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করে, তখন চীন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে নিজেদের ভূমিকার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরে। দেশটিতে জানায়, শান্তি এগিয়ে নিতে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কয়েক ডজন ফোনকল করেছে এবং প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিজেও লড়াই বন্ধের জন্য পরামর্শ দিতে হস্তক্ষেপ করেছেন।

সেদিনই চীন থেকে একটি বিমান তেহরানে অবতরণ করে। বিমানটিতে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি চালান ছিল। এর মধ্যে এমন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ছিল, যেগুলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থার অংশ তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইরানের শুল্কসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানতে পেরেছে।

চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত চীন থেকে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০টি চালানের মধ্যে এটি ছিল একটি। এসব চালানে এমন ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ ছিল, যেগুলো বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজেই ব্যবহার করা যায়। ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ওই চালান পৌঁছানোর দুই দিন পর আরও এক ডজনের বেশি চালান আসে। এসব চালানে ৬০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের এমন যন্ত্রাংশ ছিল, যেগুলো ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটন সফর করছেন সি। এই বৈঠকে বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা এবং তাইওয়ান সম্পর্কসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু বৈঠকের ঘরে সবচেয়ে বড় অনুচ্চারিত বিষয় হয়ে থাকবে ইরানের প্রতি চীনের অব্যাহত সমর্থন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চীন এখন ইরানের তেলের একমাত্র বড় ক্রেতা হয়ে উঠেছে। এর ফলে চলতি বছর তেহরানকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এবং এই অর্থপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা বলছেন, চীনা ফ্রন্ট কোম্পানিগুলো এসব অর্থ পাচারে সহায়তা করে। আর চীনা ব্যাংকগুলো দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে, চীনের মুদ্রা ব্যবহার করে, লেনদেন পরিচালনা করে, যাতে মার্কিন নজরদারি এড়ানো যায়।

যুদ্ধক্ষেত্রেও চীনের ভূমিকা রয়েছে। ওয়াশিংটন জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী—চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সংগ্রহ করা স্যাটেলাইট ছবি এমন একটি ইরানি হামলার সঙ্গে যুক্ত করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা, যাতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হন। জার্নালের দেখা একটি নথি এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, চীনা কোম্পানিগুলো ওই হামলায় ব্যবহৃত ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সরবরাহ করতেও সহায়তা করেছে।

এসব কর্মকাণ্ড ইরানের প্রতি চীনের এমন এক মাত্রার সমর্থনের চিত্র তুলে ধরে, যার কথা এর আগে প্রকাশ্যে জানানো হয়নি এবং ট্রাম্প প্রশাসনও স্বীকার করেনি। এই সমর্থন এমন একটি সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে সহায়তা করেছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে, অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিচ্ছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

বেইজিং বলেছে, তারা ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলে এবং ‘চীনের সঙ্গে সংঘাতের যোগসূত্র তৈরি করে চীনকে কলঙ্কিত করার প্রচেষ্টার’ বিরোধিতা করে। চীন বলেছে, ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।

এর আগে চীন বলেছে, তারা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপাদান রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এসব উপাদান বেসামরিক ও সামরিক উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যেতে পারে। চীন আরও বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে। এর মধ্যে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর অনুমোদনহীন বাণিজ্যের ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। চীনের ভাষ্য, এসব নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে শত শত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর মধ্যে চীনের এমন কোম্পানি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যারা তেহরানকে সহায়তা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে। এসব পদক্ষেপ এবং ইরানের বাণিজ্যের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতিতে সংকোচন দেখা দিয়েছে।

তবে ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আরও কঠোরভাবে সংঘাতে জড়াতে হোয়াইট হাউস অনিচ্ছুক বলেই প্রমাণিত হয়েছে। গত বছর শুল্কযুদ্ধের সময় চীন যে মার্কিন অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার বিভিন্ন উপায় রাখে, তার মধ্যে আমেরিকার বিরল মৃত্তিকা উপাদানে প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়টিও ছিল। এরপর ট্রাম্প চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

আকাশপথে চালান

ওয়াশিংটন জার্নাল যে চালানগুলো পর্যালোচনা করেছে, সেগুলো এ বছর চীন থেকে ইরানে পণ্যবাহী ফ্লাইট বৃদ্ধির অংশ। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নৌবাহিনী যখন ইরানের সমুদ্রপথের বাণিজ্য আটকে দিচ্ছে, তখন এই আকাশপথের সরবরাহ ব্যবস্থা ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে পরিণত হয়েছে।

চালানগুলো তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। ইরানের শুল্ক রেকর্ড অনুযায়ী, বাক্সগুলোতে ছিল জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস, বৈদ্যুতিক মোটর এবং উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ। এসব শুল্ক রেকর্ড বাণিজ্যবিষয়ক ডেটাবেস ইমপোর্টজিনিয়াস সরবরাহ করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুনের শেষ পর্যন্ত পাওয়া রেকর্ডে দেখা যায়, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইরানি কোম্পানিগুলোর কাছে হাজার হাজার চালানে এমন পণ্য পাঠানো হয়েছে, যেগুলো ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেক চালানের নথিতে ‘আর্টিকেল ১১৯’-এর উল্লেখ রয়েছে। এটি ইরানের শুল্কবিধির একটি ধারা, যার আওতায় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে সম্পূর্ণ শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়।

চীন কয়েক দশক ধরে ইরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেল রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে দেশটিকে বাধ্য করার লক্ষ্যে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি চালু করার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এই অভিযানের অংশ হিসেবে ইরানকে সহায়তা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং তাদের যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

এসব নিয়ম প্রত্যাখ্যান করে তেহরান ও বেইজিং ২০২১ সালে ২৫ বছরের একটি কৌশলগত চুক্তি সই করে। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মতে, চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক হয়ে ওঠে এবং ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি কিনতে শুরু করে। জার্নাল জানিয়েছে, চীনা ব্যাংক ও হংকংয়ের শেল কোম্পানিগুলোর একটি জটিল নেটওয়ার্ক ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করার জন্য গড়ে ওঠে। হংকং বলেছে, তারা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করে, কিন্তু বিভিন্ন দেশের একতরফাভাবে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে না। তাদের মতে, এসব নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে।

চীনা দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর রপ্তানিকারকরাও ইরানে বাণিজ্য মেলায় অংশ নিতে শুরু করেন। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্থানীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে তারা নিজেদের কোম্পানির স্লোগান ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেছিল।

পরবর্তী বছরগুলোতে চীনা কোম্পানিগুলো ইরানের জন্য সোডিয়াম পারক্লোরেটের মতো রাসায়নিক উপাদান তৈরি করে। এই উপাদান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রপেল্যান্ট বা জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। ২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ধ্বংস হওয়ার পর দেশটির অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে এসব রপ্তানি ইরানের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০২৫ সালে ওয়াশিংটন জার্নাল এবং অন্যান্য গণমাধ্যম এসব বিক্রির খবর প্রকাশ করার পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ওই বছরের পরে মার্কিন বাহিনী চীন থেকে ইরানে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য উপাদান বহনকারী একটি জাহাজে অভিযান চালায়। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে ওয়াশিংটন বিষয়টি নজরদারিতে রেখেছে।

রাসায়নিক উপাদান বিক্রির চেষ্টা করা একটি চীনা কোম্পানি হাওকুন এনার্জি গত ডিসেম্বরে ইরানের জন্য পণ্য আমদানিকারক এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জানায়, সোডিয়াম পারক্লোরেট রপ্তানির জন্য সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন। জার্নালের দেখা একটি চিঠিতে হাওকুন লিখেছিল, তারা চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘লাইসেন্সের একটি অংশ গোপনীয়ভাবে প্রক্রিয়া করার’ ব্যবস্থা করেছিল।

এর আগে ট্রেজারি বিভাগ হাওকুন এবং ওই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে ইরানের তেল চীনে বিক্রিতে সহায়তা করার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ডিসেম্বরের চিঠিতে বলা হয়, সোডিয়াম পারক্লোরেটের লেনদেনের জন্য হাওকুন বেইজিংভিত্তিক একটি শেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিল। জার্নাল যাচাই করে দেখেছে, চিঠির তারিখের কয়েক সপ্তাহ আগে ওই কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত এগিয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শাহেদ ড্রোনের জন্য উপকরণ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ইরানের শুল্ক বিভাগের তথ্য দেখায়, চীন থেকে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩০০ টন রাসায়নিক যৌগ পাঠানো হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য প্রথম দিকে ধসে পড়ে বলে ইরানের শুল্ক বিভাগের তথ্য এবং তেল পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য থেকে জানা যায়। এপ্রিলে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ঘোষণা করা হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

জবাবে তেহরান মাহান এয়ারের মাধ্যমে চীন ও ইরানের মধ্যে আকাশপথের যোগাযোগ বাড়িয়ে দেয়। মাহান এয়ার ইরানি একটি বিমান সংস্থা। এটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মতে, এই বিমান সংস্থাটি ইরানের জন্য অর্থ, অস্ত্র ও জনবল পরিবহন করেছে। ফ্লাইটরাডার ২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরুতে বেইজিং, সাংহাই ও গুয়াংজু থেকে তেহরানে মাহান এয়ারের সপ্তাহে চারটি ফ্লাইট চললেও এপ্রিলের শেষ নাগাদ তা বেড়ে প্রায় ২৭ টিতে দাঁড়ায়।

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী গবেষকেরা বলছেন, এসব চালানের সঙ্গে জড়িত রয়েছে চীনের স্বল্পপরিচিত কিছু সরবরাহকারী এবং ইরানি আমদানিকারকেরা। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) অর্থনীতি কর্মসূচির উপপরিচালক কেট কোরেন বলেন, সরবরাহ করা কিছু উপাদান শাহেদ ড্রোন তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। সস্তা কিন্তু প্রাণঘাতী এসব ইরানি ড্রোন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

শিগগির প্রকাশিত হতে যাওয়া এক প্রতিবেদনে কোরেন বলেছেন, তিনি চীনের কয়েকটি কোম্পানির সন্ধান পেয়েছেন, যারা চলতি বছর সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রকাশ্যে দিয়েছে। এসব যন্ত্রাংশের মধ্যে শাহেদ ড্রোনে ব্যবহৃত উপাদানও রয়েছে।

মে মাসে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট চীন ও হংকংভিত্তিক কয়েকটি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, এসব কোম্পানি ইরানকে অস্ত্র সংগ্রহে সহায়তা করার চেষ্টা করছিল। এর মধ্যে কাঁধ থেকে ছোড়া যায় এমন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী ব্যবস্থাও ছিল। ওই মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, মিলিশিয়া সদস্যদের ওই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব অস্ত্রকে ম্যানপ্যাডস বলা হয় এবং এগুলো দিয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা যায়।

সাবেক ট্রেজারি কর্মকর্তাদের মতে, ইরান বর্তমানে দেশেই তৈরি ম্যানপ্যাডস ব্যবহার করে, যেগুলো পুরোনো চীনা মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে সাবেক কর্মকর্তারা বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা চীনের সর্বশেষ মডেলগুলো পাওয়ার চেষ্টা করছেন, কারণ সেগুলো আরও কার্যকর।

এর পরের কয়েক সপ্তাহে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সামরিক বাহিনী ও আইআরজিসির জন্য অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগে আরও কয়েকজন চীনা ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অস্ত্র সংগ্রহকারী নেটওয়ার্ক ইরানের সেন্টার ফর ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি কো-অপারেশনের জন্য ম্যানপ্যাডস কেনার চেষ্টা করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে তৈরি অস্ত্রকে দেশে উৎপাদনের উপযোগী করে তোলার কাজে যুক্ত। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, ইরানি ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন করতে ওই নেটওয়ার্ক বেলারুশ হয়ে ম্যানপ্যাডস ইরানে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। তবে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সই করে। কয়েক দিন পর ইরানের শুল্ক বিভাগ চীন থেকে আকাশপথে আসা ৬০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের চালানের তথ্য নথিভুক্ত করে। মার্কিন সরকার বলেছে, এসব যন্ত্রাংশ বিভিন্ন সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের ফ্লাইট কন্ট্রোল ইউনিটেও এসব উপাদান ব্যবহার করা হয়।

জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র মাহান এয়ারের হয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে চীনভিত্তিক একটি কোম্পানিও ছিল, যেটি মার্কিন সরকারের দাবি অনুযায়ী মাহান এয়ারের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করত এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ পরিবহনের সমন্বয় করত। ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্র আরও ১০০ টির বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে চীনকে কতটা কঠোরভাবে চাপ দেওয়া হবে, তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য বাড়ছিল।

জুলাইয়ে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও ‘বিভিন্ন পর্যায়ে’ ইরানকে সহায়তা করছে। কয়েক দিন পর ট্রাম্প এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না তারা সহায়তা করছে কি না।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ব্যক্তিগতভাবে তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে চীন ইরানকে অস্ত্র দেবে না।

সি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বিশ্বাস করি। তারা কিছু কিছু করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অন্তত, তা বড় কোনো বিষয় হয়ে ওঠেনি।’ একই সপ্তাহে ম্যানিলায় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ‘চীন যা কিছু করেছে, তার কোনো কিছুই কোনোভাবেই’ সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করেনি। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে বেইজিং ‘বেশ সহযোগিতাপূর্ণ’ আচরণ করেছে।

পর্দার আড়ালে, চীনকে সম্পৃক্ত করে ইরানের প্রতি সমর্থনের ক্ষেত্রে চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এর একটি ঘটনায় মার্কিন কর্মকর্তারা ইরান থেকে মিসরে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রির লেনদেন শনাক্ত করেন, যার মূল্য মার্কিন ডলারে পরিশোধ করা হচ্ছিল এবং যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছিল।

লেনদেনগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখা থেকে মিসরের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ‘বানক ইজিপ্টে’র মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেজারি কর্তৃপক্ষ ব্যাংকটিকে ওই লেনদেন বন্ধ করার সতর্কবার্তা দেয়। এর পরিবর্তে বানক ইজিপ্টের অর্থ পরিশোধের মুদ্রা চীনের ইউয়ানে পরিবর্তন করে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা বলেন, এসব অর্থ চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার কথা ছিল। এটি একটি চীনা আর্থিক নেটওয়ার্ক, যেখানে লেনদেনের তথ্য মার্কিন কর্তৃপক্ষের জন্য অনুসরণ করা কঠিন।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতে পেরে এবং মিসরীয় কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের আপত্তি জানালে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয় বলে ওই ব্যক্তিরা জানান। পরে ট্রেজারি বানক ইজিপ্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তারা ব্যাংকটির সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাখাকে ‘তেহরানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র’ হিসেবে অভিহিত করে এবং মার্কিন ডলারে ব্যাংকটির প্রবেশাধিকার বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি চীন ও মিসরের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। বিস্তারিত বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জানান, চীনের সন্দেহ ছিল মিসরীয় কর্মকর্তারা মার্কিনদের কাছে তথ্য দিয়েছেন। ওই ব্যক্তিদের একজন আরও জানান, চলতি মাসের শুরুতে কায়রোতে মিসরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক শীর্ষ বৈঠকে শি নিজেই বিষয়টি উত্থাপন করেন।

স্যাটেলাইটের ছবি

ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তখনও মনে করছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

গত ১৭ জুলাইয়ের একটি হামলার আগে ও পরে ইরান চীনের স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করেছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। ওই হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয় এবং কর্মকর্তারা স্যাটেলাইট ছবির ব্যবহারকে সরাসরি ওই হামলার সঙ্গে যুক্ত করেন। এর আগেই মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের তিনটি স্যাটেলাইট-চিত্র সরবরাহকারী কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। মার্কিন সরকারের দাবি ছিল, এসব কোম্পানি এমন তথ্য সরবরাহ করেছে, যা ইরানকে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করতে পারে।

আগস্টের শেষ দিকে ট্রাম্প এবং ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ শুরু করেন। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ইরানি শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা ‘প্রতিটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন বিচ্ছিন্ন করা।’ যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল পরিবহনকারী চীনের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজ এবং ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সংগ্রহে সহায়তাকারী চীনা কোম্পানি ও ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে চীনের কোনো বড় কোম্পানিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।

সাংবাদিকেরা দুইবার বেসেন্টকে জিজ্ঞেস করেন, প্রশাসন চীনা ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করবে কি না। বেসেন্ট চীনকে আলাদাভাবে উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশেরই’ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ইরানের জন্য তেল রপ্তানি করা অনেক কঠিন করে তুললেও কিছু তেল এখনও চীনে যাচ্ছে। কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ চালুর পরের সপ্তাহে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল চীনে সরবরাহ করা হয়। এদিকে ফ্লাইটরাডার ২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মাহান এয়ার চীন থেকে ইরানে ৩৯টি ফ্লাইট পরিচালনা করে, যা যুদ্ধের আগে তাদের উড়ানের সংখ্যার দ্বিগুণ। এসব ফ্লাইটের অনেকগুলোতেই যাত্রী পরিবহনের চেয়ে কেবল কার্গো পরিবহনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ফ্লাইটরাডার ২৪-এ শনাক্ত করা অনেক ফ্লাইটই বিমান সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বুকিংয়ের জন্য পাওয়া যায়নি।

গত সপ্তাহে ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গণমাধ্যম জানিয়েছিল, মাহান এয়ার ওমান ও তুরস্কে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করবে। তবে বিমান সংস্থাটি চীনে এখনও ফ্লাইট পরিচালনা করছে।