হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ভেঙে পড়তে পারে ইসরায়েল রাষ্ট্র, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা: সিআইএর প্রতিবেদন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট জেরুজালেমের কেন্দ্রস্থলে ইহুদিদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের দিন সাব্বাতের ‘ক্যাফে বাসিমতা’ খোলা রাখার বিরুদ্ধে গোঁড়া অর্থোডক্স ধর্মাবলম্বীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং একই সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীরা ক্যাফেটির সমর্থনে পাল্টা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ছবি: এএফপি

ইসরায়েলিদের মধ্যকার উত্তেজনার কারণে দেশটি অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এক প্রতিবেদন। এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন এমন একদল বিশেষজ্ঞ, যাদের কাজ হলো প্রচলিত বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে ‘বিকল্প বিশ্লেষণ’ দেওয়া। গতকাল সোমবার প্রকাশিত মার্কিন বিকল্পধারার সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সিআইএর ওই প্রতিবেদনের নাম ‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইদিন।’ এতে বলা হয়েছে, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসরায়েলে পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে। ওই নির্বাচনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ধরে রাখার জন্য লড়াই করবেন।

প্রতিবেদনের লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, ইসরায়েলের সবচেয়ে বিভাজন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটি হলো অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের বা আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইসরায়েলিদের দীর্ঘদিনের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের ছাড়। এই বিরোধ নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের ভেতরের গভীর বিভাজন প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, নেতানিয়াহু তাঁর দুই আল্ট্রা-অর্থোডক্স রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন ধরে রাখতে পারবেন কি না। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এই দুটি দলই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র।

ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য কয়েক লাখ রিজার্ভ সেনা মোতায়েন করা হলেও, আল্ট্রা-অর্থোডক্স পুরুষেরা ঐতিহাসিকভাবে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে ছাড় পেয়ে আসছেন। এর ফলে তারা পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইয়েশিভায় ধর্মীয় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামরিক সেবার এই ছাড় বাতিলের জন্য চাপ আরও বেড়েছে।

আল্ট্রা-অর্থোডক্সদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজনীয় আইন পাস করতে নেতানিয়াহুর জোট বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে সামরিক সেবা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে কয়েক ডজন তরুণকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যার পেছনে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে এমন একটি পরিস্থিতিরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে যেখানে দশ হাজারের বেশি ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সাবেক সেনা বেসামরিক জীবনে ফিরে এসে পুনরায় সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। ইসরায়েলের রিজার্ভ সেনারা নিজেদের অস্ত্র বাড়িতে রাখার অনুমতি পান। দেশটিতে জনসমক্ষে অ্যাসল্ট রাইফেল বহন করাও সাধারণ ঘটনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলে অস্থিতিশীলতা তৈরির আরেকটি কারণ হতে পারে দখলকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি, পাশাপাশি খাদ্যের মূল্যস্ফীতি এবং সামরিক ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি।

ড্রপ সাইট নিউজ জানিয়েছে, সিআইএর এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটির রেড সেল। এটি সিআইএর ভেতরে থাকা একটি আধা স্বাধীন ইউনিট, যার বিশেষ কাজ হলো প্রচলিত ধারণার বিপরীত মত তুলে ধরা এবং প্রতিষ্ঠিত অনুমান ও পক্ষপাতকে চ্যালেঞ্জ করা। প্রতিবেদনটি নির্বাচনের আগে ইসরায়েলে জমে ওঠা বিভিন্ন চাপের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন থেকে স্পষ্ট কোনো ফলাফল না-ও আসতে পারে।

ইসরায়েলের বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহু অথবা তার বিরোধী রাজনৈতিক জোট, কোনোটিই পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার পর্যায়ে নাও পৌঁছাতে পারে। প্রতিবেদনের লেখকেরা এসব চাপ কীভাবে শেষ পর্যন্ত গৃহসংঘাতে রূপ নিতে পারে, সেটিও বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন।

এর মধ্যে একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, বিদেশি প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানিগুলো ইসরায়েলে বিনিয়োগ ও নিয়োগ কমিয়ে দিলে। আরেকটি কারণ হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে আগ্রহ হারালে অথবা বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় না রাখলে।

তবে প্রতিবেদনে মূলত ইসরায়েলিদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজনের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক, যারা বৈষম্যের শিকার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যকার উত্তেজনা ও বিভাজনকে প্রতিবেদনে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

শুক্রবার ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা একজন ফিলিস্তিনি রাজনীতিক আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে সরে দাঁড়ান। ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট তাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়ার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তবে একই আদালত ইসরায়েলি নাগরিক ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী আরও চারটি রাজনৈতিক দলের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে।