মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতাভুক্ত তিন দেশের সামরিক প্রধানেরা সৌদি আরবে বৈঠক করেছেন। ইয়েমেনে সংঘাত তীব্রতর হওয়া এবং সৌদি আরবের ওপর হুতিদের অব্যাহত হামলার প্রেক্ষাপটে জোটের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত আল আরব আল–জাদিদ বা দ্য নিউ আরবের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এর আগে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশটির চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল সেলচুক বায়রাকতারোগলু জোটের তিন দেশের সামরিক প্রধানদের বৈঠকে অংশ নিতে সৌদি আরব সফর করছেন। পরে শুক্রবার আঙ্কারা তিন সামরিক কর্মকর্তার সামরিক পোশাক পরা ছবি প্রকাশ করে জানায়, বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকটি কোথায় হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে তিন দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির মাধ্যমে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান এই জোটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।
চুক্তির আওতায় গঠিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক আগস্টের শেষ দিকে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সৌদি আরবের বৈঠকে তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চুক্তিতে সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা রয়েছে।
এমন সময়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইয়েমেনে সংঘাত তীব্রতর হওয়ার পাশাপাশি হুতিরা সৌদি আরবের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে।
নিউইয়র্কে বৈঠকের সময় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তিন দেশের সামরিক প্রধানদের জরুরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান, পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জোটের সচিবালয়, কমিটি ও ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন।
এসব সংস্থার কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিয়েও তাঁরা আলোচনা করেন। মন্ত্রীরা মক্কা এবং সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হামলার তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে এসব হামলার জবাবে সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের আওতায় নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রিয়াদের রয়েছে বলেও তাঁরা স্বীকার করেন। তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন। এ সময় তাঁরা আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সামুদ্রিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
চলমান আঞ্চলিক সংকটগুলোর স্থায়ী শান্তিপূর্ণ সমাধান, উত্তেজনা প্রশমন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘সঠিক পথে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘একটি কঠিন ভৌগোলিক অঞ্চলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন কোনো ধারণা সামনে আনা হলে কিংবা নতুন কোনো সদিচ্ছা প্রকাশ করা হলে, এমন মানুষ থাকাটাই স্বাভাবিক, যারা তা মেনে নেবে না।’
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, জোটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হলে তিনটি দেশ আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে যাবে, এ বিষয়ে তাঁর ‘কোনো সন্দেহ নেই’।
বুধবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নওমান মাহমুদকে জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে জোটের সচিবালয়ের সদর দপ্তর হিসেবে রিয়াদকে নির্বাচন করা হয়। অন্যদিকে, মহাসচিবের পদে প্রথম তিন বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবে পাকিস্তান। এরপর তিন দেশের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই পদ হস্তান্তর করা হবে।
তারও আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সতর্ক করে বলেছিলেন, ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব রিয়াদ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোট সক্রিয় করা হতে পারে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা চালানোর সময় তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন।
মক্কা চুক্তির লক্ষ্য হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করা। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিনটি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।