হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজে অস্বস্তিকর শান্ত পরিস্থিতি, জব্দ জাহাজ ও হাঙরশিকারিদের দেখল বিবিসি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

হরমুজ প্রণালিতে বিবিসির সাংবাদিক। ছবি: বিবিসি

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বন্দর আব্বাসের মাছ ধরার ঘাটে আবারও ব্যস্ততা ফিরতে শুরু করেছে। জেলেরা সাগর থেকে ধরা মাছ নামাচ্ছেন, কেউ জালে আটকে পড়া ছোট হাঙর দেখিয়ে স্থানীয় খাবার ‘শার্ক স্যান্ডউইচ’-এর কথা বলছেন। বাইরে থেকে দৃশ্যটি স্বাভাবিক মনে হলেও বন্দরটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত—যেখানে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের গভীর প্রভাব এখনো স্পষ্ট।

যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো বিবিসির আন্তর্জাতিক সাংবাদিকেরা ইরানের দিক থেকে হরমুজ প্রণালি পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধবিরতির পর সমুদ্র কিছুটা শান্ত হলেও পুরো পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অনুমতি ছাড়া চলাচলকারী জাহাজে গুলি চালাতে শুরু করলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে বহু জাহাজ আটকে যায়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং জ্বালানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয়।

যুদ্ধবিরতির পর আংশিকভাবে প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বিবিসি সমুদ্রপথে যাওয়ার সময় আইআরজিসির জব্দ করা দুটি কনটেইনার জাহাজ ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ ও ‘এপামিনোনদাস’ এখনো নোঙর করে থাকতে দেখেছে। এ ছাড়া আরও অনেক মালবাহী জাহাজ ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষায় সমুদ্রে অবস্থান করছে।

বন্দর আব্বাসকেন্দ্রিক জেলেরা আবারও ফিরেছেন পানিতে। ছবি: বিবিসি

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ না করলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই বন্দর আব্বাস শুধু একটি বন্দর নয়, এটি ইরানের নৌবাহিনী ও আইআরজিসির অন্যতম প্রধান ঘাঁটি এবং দেশটির সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শহরের ভেতরে স্বাভাবিক জীবনের কিছু চিত্র ফিরলেও যুদ্ধের ক্ষত এখনো স্পষ্ট। দোকানপাট খুলেছে, বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে, পরিবারগুলো ঘরে ফিরেছে। কিন্তু খুশনুদি সড়কে একটি বহুতল ভবনের ধ্বংসস্তূপ এখনো যুদ্ধের ভয়াবহতার সাক্ষ্য বহন করছে। গত ২৬ মার্চ ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভবনটির অর্ধেক ধসে পড়ে। সেখানে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত তিনজন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন আইআরজিসির একজন নৌ কর্মকর্তা। ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি, যাঁর মৃত্যুর বিষয়টি পরে ইরানও নিশ্চিত করে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজগান প্রদেশে যুদ্ধ চলাকালে বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক সদস্য মিলিয়ে অন্তত ২৬১ জন নিহত হয়েছেন। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা অ্যাকলেডের তথ্য বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বন্দর আব্বাস ও এর আশপাশে অন্তত ৯৬টি মার্কিন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার বড় অংশই সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হলেও অনেক স্থাপনা আবাসিক এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে বন্দর আব্বাসের মেয়র মেহদি নোবানি দাবি করেছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইরান নিশ্চিতভাবেই হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেবে।

প্রাণ ফিরছে বন্দর আব্বাসের বাজারে। ছবি: বিবিসি

স্থানীয় বাজারে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। কেউ কেউ বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাসের কথাও জানান। তবে ফল বিক্রেতা ৫৫ বছর বয়সী ফাতেমেহ বলেন, যুদ্ধের কারণে তাঁর ছেলে চাকরি হারিয়েছেন, এখন পুরো পরিবার তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আরেক বাসিন্দা মাসুমেহ বলেন, ‘প্রতিটি যুদ্ধই মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবু আমাদের ধৈর্য ধরতেই হবে।’

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকলেও এখানকার সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের প্রকৃত অর্থ হলো হারানো জীবিকা, আতঙ্কে কাটানো রাত ও শান্তির জন্য অপেক্ষা।