হোম > বিশ্ব > লাতিন আমেরিকা

টুনা মাছের রাজধানীতে মাদকযুদ্ধ—টার্গেটে জেলেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

ইকুয়েডরের বন্দরনগরী মান্তা বিশ্বজুড়ে ‘টুনা মাছের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানকার মানুষ প্রশান্ত মহাসাগরের সমৃদ্ধ জলরাশিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু দারিদ্র্য, সীমিত কর্মসংস্থান এবং বিপুল অর্থের হাতছানিতে মান্তার কিছু জেলে এখন জড়িয়ে পড়ছেন কোকেন পাচারের সঙ্গে। এতে পাচারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও মাদকযুদ্ধের ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছেন অসংখ্য জেলে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মান্তার এক জেলে জানান, মাছ ধরার মাধ্যমে যেখানে মাসে প্রায় ৩০০ ডলার আয় হয়, সেখানে একটি কোকেন পাচারের অভিযানে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ডলার পর্যন্ত পাওয়া যেতে পারে। ২০২৩ সালে তিনি প্রায় দুই টন কোকেন পরিবহনের বিনিময়ে ৩০ হাজার ডলার পেয়েছিলেন। মেক্সিকোর উপকূলের কাছে আরেকটি নৌযানে মাদক তুলে দেওয়ার পর দেশে ফিরে সেই অর্থে পরিবারের পুরোনো বেতের ঘরের বদলে ইটের বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি।

এই অবৈধ বাণিজ্যকে ঘিরে মান্তায় এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভয়ংকর অপরাধী চক্র। ২৮ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মান্তা থেকে যাত্রা করা অন্তত আটটি ইকুয়েডরীয় মাছ ধরার নৌযান ধ্বংস করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, এসব নৌযান ছোট ছোট মাদকবাহী নৌযানের জন্য সমুদ্রে ভাসমান জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সামরিক কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌযানগুলো ডুবিয়ে দেওয়ার আগে এর আরোহীদের সরিয়ে ইকুয়েডরের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ স্থানীয় কিছু মাছ ধরার কোম্পানি, ব্যবসায়ী ও নৌযানকে নিয়ে গঠিত একটি কথিত ‘নারকোটেররিস্ট নেটওয়ার্ক’-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই নেটওয়ার্ক মান্তা থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ কোকেন পরিবহনে সহায়তা করে। পরে মেক্সিকোর মাদকচক্রগুলো সেই কোকেন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়।

তবে মার্কিন অভিযান নিয়ে বিতর্কও তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল সেপ্টেম্বরে এক প্রতিবেদনে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলাকে বেআইনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এসব ঘটনা সম্ভাব্যভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে। মার্কিন সামরিক বাহিনী অবশ্য বলছে, তাদের অভিযান যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।

মান্তার অনেক জেলের পরিবার বলছে, তাদের স্বজনেরা মাদক পাচারে জড়িত ছিলেন না। সম্প্রতি শহরের সমুদ্রতীরে স্বজনেরা ‘আমাদের জেলেদের জন্য ন্যায়বিচার’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সপ্তাহে মান্তার একটি আদালত মার্কিন বাহিনীর ডুবিয়ে দেওয়া দুটি নৌযান থেকে আটক ২৮ জেলেকে মুক্তির নির্দেশ দেয়। আদালতের মতে, অভিযানটি অনুমোদিত ছিল না এবং হামলায় অপরাধের আলামতও ধ্বংস হয়েছে।

মান্তার জেলেদের অভিযোগ, সমুদ্রে তাঁদের ওপর ড্রোন হামলাও হয়েছে। মার্চে দুটি মাছ ধরার নৌযানের ক্রুরা দাবি করেন, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কাছে ড্রোন হামলার পর তাঁদের নৌযান ছেড়ে দিতে হয়। একটি নৌকার ক্যাপ্টেন হার্নান ফ্লোরেস জানান, ড্রোন হামলার পর ইংরেজিভাষী অস্ত্রধারীরা তাঁদের আটক করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র মার্চের ওই ড্রোন হামলা এবং জানুয়ারিতে একটি নৌযান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দেশটির দুই বড় অপরাধী গোষ্ঠী (লস চোনেরোস ও লস লোবোস) মান্তা ও এর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়ছে বলে জাতীয় পুলিশ বাহিনী জানিয়েছে। উভয় গোষ্ঠীর মেক্সিকোর মাদকচক্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মান্তায় সহিংসতাও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। গত বছর শহরটির হত্যার হার প্রতি এক লাখে প্রায় ১৩৭ জনে দাঁড়ায়; এক দশক আগে যা ছিল ৫ দশমিক ৪। চলতি বছরের জুনে সেখানে এক প্রসিকিউটর গুলিতে নিহত হন এবং ২০২৩ সালে শহরের মেয়রও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

সমাজবিজ্ঞানী ব্রায়ান মেন্দোজার মতে, বৈধভাবে ভালো আয়ের সুযোগের অভাব অনেক বাসিন্দাকে মাদক ব্যবসার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মাদক পাচার এখন অনেকের কাছে বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক উন্নতির সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ জেলে জনি গারাই। ২০১৭ সালে নৌকায় কোকেন পরিবহনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগের পর গত বছর মুক্তি পান তিনি। পরে আবার সমুদ্রে যান। চলতি বছরের জুলাইয়ে এল সালভাদরের নৌবাহিনী এক টনের বেশি কোকেনসহ তাঁকে আটক করে। তাঁর মা এলেনা ভেলিজ বলেন, ছেলের ছবি হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন।

মান্তার উপকণ্ঠে জেলে পরিবারের সদস্যদের একটি সংগঠন পরিচালনা করেন কার্লোস কারিয়ন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে শত শত ইকুয়েডরীয় জেলে মাদক পাচারের অভিযোগে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের পরিবারগুলো দারিদ্র্যের মধ্যেও এখন আরও অসহায় হয়ে পড়েছে।